অভিভাবকহীন অর্ধশতকের দেওয়ানহাট ওভারব্রিজ—বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক : চট্টগ্রাম নগরীর যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো দেওয়ানহাট ওভারব্রিজ। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে এই সেতুর ওপর নির্ভর করে চলছে নগরীর উত্তর ও দক্ষিণ অংশের মানুষের যাতায়াত, পণ্য পরিবহন এবং বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম। প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন ব্যবহার করছে সেতুটি। অথচ এত গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনাটির কোনো স্বীকৃত অভিভাবক নেই। চারটি সরকারি সংস্থার মধ্যে দায়িত্ব নিয়ে চলছে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন। সেই প্রশাসনিক দায়হীনতার খেসারত দিচ্ছে নগরবাসী।

দীর্ঘ সময় নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেতুটি এখন দৃশ্যমানভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। বিভিন্ন স্থানে কংক্রিট খসে রড বেরিয়ে এসেছে, পিলারে ধরেছে ক্ষয়, ডেকে দেখা দিয়েছে ফাটল। প্রকৌশলীরা বলছেন, সেতুটির বর্তমান অবস্থা উপেক্ষা করা হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

উত্তর-দক্ষিণের প্রধান সংযোগ
বন্দরনগরী চট্টগ্রামের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে রেললাইন। এই রেললাইন নগরীকে কার্যত দুই ভাগে ভাগ করেছে। সেই বিভাজন অতিক্রম করে দুই অংশকে সংযুক্ত করেছে দেওয়ানহাট ওভারব্রিজ। টাইগারপাস ও দেওয়ানহাটের মাঝামাঝি অবস্থান হওয়ায় এটি শুধু একটি সেতু নয়, বরং নগরীর অন্যতম প্রধান পরিবহন করিডোর।

চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশ ও বের হওয়া বিপুলসংখ্যক কনটেইনারবাহী যান, শিল্পাঞ্চলগামী ট্রাক, গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত যানবাহনের একটি বড় অংশ প্রতিদিন এই সেতু ব্যবহার করে। ফলে সেতুটির কার্যকারিতা ব্যাহত হলে নগরীর যান চলাচল ও সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

নির্মাণ হয়েছিল স্বাধীনতার পর
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, স্বাধীনতার পর রেললাইনের ওপর যান চলাচলের সুবিধার্থে বাংলাদেশ রেলওয়ের অর্থায়নে এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের বাস্তবায়নে ১৯৭৪-৭৫ সালের দিকে নির্মিত হয় চট্টগ্রামের প্রথম রেলওয়ে ওভারব্রিজটি। প্রায় ১ হাজার ২২০ ফুট দীর্ঘ ও ৫৬ ফুট প্রশস্ত এই সেতু নির্মাণের সময়কার যানবাহনের চাপ এবং বর্তমান বাস্তবতার মধ্যে রয়েছে বিস্তর পার্থক্য।

সেই সময় কনটেইনার পরিবহন, ভারী ট্রেইলার কিংবা বহুঅক্ষবিশিষ্ট পণ্যবাহী যান এতটা ছিল না। কিন্তু বর্তমানে প্রতিদিন শত শত অতিভারী যানবাহন সেতুটি ব্যবহার করছে, যা মূল নকশার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে বলে মনে করছেন প্রকৌশলীরা।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কার দায়িত্ব?
সেতুটি নির্মাণের পর দীর্ঘ পাঁচ দশকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক), সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের কেউই এর পূর্ণাঙ্গ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করেনি।

রেলওয়ে বলছে, তারা কেবল রেললাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। চউকের দাবি, তারা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে দায়িত্ব হস্তান্তর করে। চসিকের ভাষ্য, আনুষ্ঠানিকভাবে সেতুটি তাদের কাছে হস্তান্তর হয়নি। অন্যদিকে সওজও নিজেদের দায় অস্বীকার করেছে। ফলে বছরের পর বছর নিয়মিত মেরামত, লোড মূল্যায়ন কিংবা কাঠামোগত নিরাপত্তা পরীক্ষা ছাড়াই চলছে সেতুটি।

চোখে পড়ছে অবহেলার চিহ্ন
সরেজমিনে দেখা যায়, ওভারব্রিজটির একাধিক পিলারে কংক্রিট খসে পড়ে ভেতরের রড উন্মুক্ত হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও রডে মরিচা স্পষ্ট। সেতুর বিভিন্ন স্থানে সারফেস ক্র্যাক বা ফাটল দেখা গেছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় বৃষ্টির পানি জমে কাঠামোর ক্ষয় আরও বাড়ছে। আগাছা জন্মে রয়েছে বিভিন্ন অংশে। এসব দৃশ্যই দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ার সাক্ষ্য বহন করছে। তারপরও প্রতিদিন এই সেতুর ওপর দিয়ে চলাচল করছে কনটেইনারবাহী ট্রেইলার, কাভার্ডভ্যান, লরি, ট্রাক, বাস, মিনিবাস, প্রাইভেটকার ও অন্যান্য যানবাহন।

কাঠামো বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি পুরোনো সেতুর জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণ হলো অতিরিক্ত লোড এবং পুনরাবৃত্ত কম্পন। চট্টগ্রাম বন্দরের কারণে দেওয়ানহাট ওভারব্রিজে সেই চাপ অন্য অনেক সেতুর তুলনায় বেশি।

সিদ্ধান্ত হয়েছিল, বাস্তবায়ন হয়নি
সেতুর ঝুঁকি বিবেচনায় ২০২৪ সালের শুরুতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নতুন ওভারব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। পাশাপাশি পুরোনো সেতুর দুই প্রান্তে হাইট ব্যারিয়ার বসিয়ে ভারী যান চলাচল বন্ধের পরিকল্পনা করা হয়। ১৫ জানুয়ারি এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগকে চিঠিও দেওয়া হয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল, নতুন সেতু নির্মাণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত শুধু হালকা যান চলাচল করবে। কিন্তু বাস্তবে সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। আজও ভারী ট্রাক ও কনটেইনারবাহী যানবাহন আগের মতোই সেতুটি ব্যবহার করছে।

এবার নতুন উদ্যোগ
ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি হলে সম্প্রতি বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পায়। গত ২ আগস্ট চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের উপস্থিতিতে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীদের একটি দল দেওয়ানহাট ওভারপাসের কারিগরি মূল্যায়ন প্রতিবেদন উপস্থাপন করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কংক্রিট ক্ষয়, রডে মরিচা, সারফেস ক্র্যাকিং এবং দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত ভারবহনের কারণে সেতুটি বর্তমানে উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।

রেট্রোফিটিংই আপাত সমাধান
বিশেষজ্ঞরা সেতুটি সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলার পরিবর্তে প্রথম ধাপে রেট্রোফিটিং ও স্ট্রেংদেনিং প্রযুক্তি প্রয়োগের সুপারিশ করেছেন। রেট্রোফিটিংয়ের মাধ্যমে বিদ্যমান কাঠামোকে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আরও নিরাপদ ও কার্যকর করা হবে। অন্যদিকে স্ট্রেংদেনিংয়ের মাধ্যমে পিলার, বিম ও অন্যান্য ভারবহনকারী অংশের শক্তি বাড়ানো হবে।

বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করা গেলে—পিলারের লোড বহনক্ষমতা প্রায় ৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে, সেতুর কার্যক্ষমতা আরও প্রায় ৩০ বছর বাড়ানো সম্ভব হবে, নতুন সেতু নির্মাণের তুলনায় কম সময় ও কম ব্যয়ে ঝুঁকি কমানো যাবে।

শুধু সংস্কার নয়, প্রয়োজন স্থায়ী ব্যবস্থাপনা
অবকাঠামো বিশেষজ্ঞদের মতে, সংস্কার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রয়োজন একটি নির্দিষ্ট সংস্থার অধীনে সেতুটির মালিকানা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিশ্চিত করা। তাদের মতে, নিয়মিত স্ট্রাকচারাল হেলথ মনিটরিং, নির্ধারিত সময় পরপর লোড টেস্ট, কংক্রিটের মান যাচাই, ক্ষয়রোধী সংস্কার এবং ওজন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু না করলে ভবিষ্যতে একই সংকট আবারও ফিরে আসবে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘দেওয়ানহাট ওভারপাস বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। অনেক আগেই এর প্রয়োজনীয় সংস্কার হওয়া উচিত ছিল। এখন বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে রেট্রোফিটিং ও স্ট্রেংদেনিংয়ের মাধ্যমে সেতুটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

সময় ফুরিয়ে আসছে
দেওয়ানহাট ওভারব্রিজ শুধু একটি সেতু নয়; এটি চট্টগ্রাম নগরীর অর্থনীতি, বন্দর কার্যক্রম এবং প্রতিদিনের নগরজীবনের অন্যতম প্রধান ভরকেন্দ্র। অথচ প্রায় পাঁচ দশক ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো কার্যত অভিভাবকহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত সংস্কার, ভারী যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং দায়িত্ব নির্ধারণ—এই তিনটি পদক্ষেপ এখন আর বিকল্প নয়, বরং অপরিহার্য। অন্যথায় অবহেলায় জীর্ণ হয়ে ওঠা এই সেতু একদিন চট্টগ্রামের জন্য বড় ধরনের মানবিক, অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ সংকটের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

চাটগাঁ নিউজ/এসএ

Scroll to Top