হাসপাতালের বেডে এক মা, অথচ পাশে নেই তার সন্তানরা

চাটগাঁ নিউজ ডেস্ক: চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ২৮ নম্বর নিউরোসার্জারি ওয়ার্ডের হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে (এইচডিইউ) গত তিন সপ্তাহ ধরে চিকিৎসাধীন মিসেস ফাহমিদা। মুখের ভাষা প্রায় হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। যে সন্তানদের জন্য সারাজীবন পরম মমতায় জীবন দিয়েছেন, এখন তাদের কাছে তিনি যেন বোঝা হয়ে গেছেন। তাই শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকেন, কখনও নীরবে ভেজান দুই চোখ।

মিসেস ফাহমিদা কক্সবাজারের বাসিন্দা শফিকুল আজাদ চৌধুরীর স্ত্রী এবং তার বয়স ৪৫ বছর।

হাসপাতালের তথ্যানুযায়ী, তিনি ১৬ মার্চ সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে ভর্তি হন। শারীরিক অবস্থার জটিলতার কারণে তাকে এইচডিইউতে নেওয়া হয়েছে, যেখানে প্রতিনিয়ত তার রক্তচাপ, পালস, অক্সিজেন এবং কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা, হৃদযন্ত্রের মনিটরিং, প্রস্রাব ও স্যালাইনের পরিমাণ দেখা হচ্ছে।

নিউরোসার্জারি ওয়ার্ডে দায়িত্বরত ডাক্তার জিসান জানান, ব্রেন স্ট্রোকের কারণে রোগী আগের তুলনায় কিছুটা সুস্থ হলেও প্রিয়জনদের কাছে তিনি পৌঁছাতে পারছেন না।

মিসেস ফাহমিদার দেখভাল করছেন ‘অজ্ঞাত রোগীর বন্ধু’ সাইফুল ইসলাম নেসার। তিনি জানান, হাসপাতালে সরবরাহ না থাকা ওষুধগুলো রোগী কল্যাণ সমিতি এবং ‘অজ্ঞাত রোগীর মেডিসিন কর্নার’ থেকে এনে ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি রোগীর জন্য বিশেষ রঙের পোশাকও দেওয়া হয়েছে।

সাইফুল ইসলাম নেসার আরও বলেন, মাকে হাসপাতালে নিয়ে আসা ছেলেরা কয়েক দিন পর চলে যান, এরপর কন্যাও এসেছিলেন কিন্তু বেশিদিন থাকেননি। সাদা চাদরের ওপর নিস্তব্ধ শরীরের পাশে কোনো আপনজন নেই।

তিনি বলেন, মিসেস ফাহমিদা এক সময় কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (কোডেক)-এ লাখ টাকা বেতনে চাকরি করতেন। যে দিন ছেলে ও তার বোন মাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন, তাদের উদ্বিগ্ন মুখভঙ্গি ও ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলা নজর কাড়েছিল। কিন্তু দিন গড়িয়ে গেলে তারা আর আসেননি। ফোন প্রায়ই বন্ধ রাখা থাকে, দায়িত্বও দেখা যায় না। যেন হাসপাতালের বেডেই মায়ের সঙ্গে সম্পর্কও ফেলে আসা হয়েছে।

এক সপ্তাহ চেষ্টা করেও ছেলেকে ফোনে পাওয়া গেলে তখন তিনি জানালেন, চিকিৎসার খরচ চালাতে পারবেন না। সাইফুল ইসলাম নেসার বলেন, অসুস্থ হলে কি একজন মা এতটাই বোঝা হয়ে যায়? স্বার্থ ফুরালে কি সম্পর্কও ফুরিয়ে যায়?

বর্তমানে মিসেস ফাহমিদা’র সেবা দায়িত্ববোধ থেকে হাসপাতালে থাকা ওয়ার্ড বয় ও নার্সরা করছেন। তবে সন্তানের উষ্ণ হাতের স্পর্শের মতো সান্ত্বনা আর কোথাও নেই।

তারা জানান, হয়তো এই মা ভাবছেন, আমার ছেলে আসবে, মেয়েটা আসবে, আমাকে বাড়ি নিয়ে যাবে। কিন্তু এক অসহায় মায়ের চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু প্রতিদিন ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে।

চাটগাঁ নিউজ/এমকেএন

Scroll to Top