সরোজ আহমেদ : পবিত্র রমজান মাসেও থামছে না সীমান্তের গোলাগুলি ও বিমান হামলা। দক্ষিণ এশিয়ার দুই মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক সামরিক সংঘর্ষ রীতিমতো উন্মুক্ত যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। যা কোনো পরাশক্তির ইন্ধনে মুসলমান মুসলমানকেই নির্বিচারে হত্যা করছে বলে ধারণা সচেতনমহলের। ধর্মীয়ভাবে সংযম ও শান্তির বার্তা বহনকারী মাসে দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হামলা, বিমান অভিযানে হতাহতের খবর এবং সীমান্তজুড়ে তীব্র উত্তেজনায় উদ্বেগ বাড়ছে আন্তর্জাতিক মহলেও।
“উন্মুক্ত যুদ্ধ” ঘোষণার পর পরিস্থিতির অবনতি
ইসলামাবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, আফগান ভূখণ্ড থেকে পাকিস্তানে জঙ্গি হামলা ও সীমান্ত অস্থিরতার জবাব দিতেই তারা সামরিক অভিযান শুরু করেছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ সাম্প্রতিক বক্তব্যে পরিস্থিতিকে “ওপেন ওয়ার” বা উন্মুক্ত যুদ্ধ হিসেবে আখ্যা দেন।
পাকিস্তানি বাহিনীর দাবি, সীমান্তবর্তী একাধিক স্থানে “সন্ত্রাসী ঘাঁটি” লক্ষ্য করে বিমান ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে এবং এতে বহু যোদ্ধা নিহত হয়েছে। তবে স্বাধীনভাবে এসব সংখ্যার সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
কাবুলের পাল্টা অভিযোগ ও প্রতিক্রিয়া
কাবুলে ক্ষমতাসীন তালেবান প্রশাসন পাকিস্তানের হামলাকে দেশের সার্বভৌমত্বের সরাসরি লঙ্ঘন বলে অভিযোগ করেছে। আফগান কর্তৃপক্ষের দাবি, হামলায় নারী ও শিশুসহ বেসামরিক নাগরিক হতাহত হয়েছেন। আফগান বাহিনীও সীমান্তের বিভিন্ন সেক্টরে পাল্টা গোলাবর্ষণ ও সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানানো হয়েছে। উভয় পক্ষই প্রতিপক্ষের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির দাবি করলেও নিরপেক্ষ সূত্রে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা এখনও স্পষ্ট নয়।
বিমান হামলা ও সীমান্তে তীব্র লড়াই
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সীমান্তবর্তী প্রদেশগুলোতে বিস্ফোরণ, আর্টিলারি শেলিং এবং যুদ্ধবিমানের শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র সরে যাচ্ছে। রমজানের সময়ে এমন সহিংসতায় সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে। ধর্মীয়ভাবে সংযম ও শান্তির বার্তা বহনকারী মাসে যুদ্ধ পরিস্থিতি মুসলিম বিশ্বেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা দ্রুত উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে। কূটনৈতিক মহল বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে এটি বৃহত্তর আঞ্চলিক অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে। সীমান্তে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস, জঙ্গি তৎপরতা এবং পারস্পরিক দোষারোপ বর্তমান সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এদিকে, পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে আফগান ভূখণ্ডে অবস্থান নেওয়া জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো তাদের দেশে হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে আফগানিস্তান দাবি করে, পাকিস্তানের সামরিক পদক্ষেপ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক সমাধানের বদলে টেকসই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনাই এই উত্তেজনা কমানোর একমাত্র পথ হতে পারে।
নিহত ও আহত
পাকিস্তানের সূত্রে বলা হয়েছে, তাদের বিমান ও স্থল হামলায় প্রায় ২৭৪ তালেবান/আফগান যোদ্ধা নিহত হয়েছে এবং ৪০০-এরও বেশি আহত হয়েছে। পাশাপাশি বহু ওয়্যারহেড, ট্যাংক, এপিসি ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
পাকিস্তানি সামরিক মুখপাত্রের আরও একটি আপডেটে বলা হয়েছে ১২ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত এবং ২৭ জন আহত হয়েছে সাম্প্রতিক সীমান্ত সংঘাতে।
আফগান/তালেবান পক্ষের দাবি মতে, তারা ৫৫ পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করেছে এবং কিছু সৈন্য ধরেছে। অধিকাংশ আফগান যোদ্ধা বা বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা নিজেদের মুখপাত্র ভাষায় কম দেখিয়েছে। আফগান গাড়ি-গৃহে হামলার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ১৩ জন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
সামরিক ও বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি
পাকিস্তান দাবি করেছে ১১৫-এর মতো ট্যাঙ্ক, আর্টিলারি গাড়ি ও অস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে।
আফগান পক্ষ বলছে, তাদের কিছু মিলিটারি পোস্ট ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি বেসামরিক এলাকায় গুলিবর্ষণের ফলে ক্ষতি হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট সংখ্যার তথ্য প্রকাশ করেনি।
এদিকে, জাতিসংঘের সহায়তা মিশন (UNAMA) জানায় যে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক বিমান হামলায় অন্তত ১৩ জন বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে, যার মধ্যে নারী ও শিশু রয়েছেন, এবং ৭ জন আহত হয়েছে। হামলা যে এলাকায় ঘটেছে সেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাড়ি ও ধর্মীয় স্থাপনায় ক্ষতি হয়েছে এবং এতে মাদ্রাসা, মসজিদ ও বসতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চাটগাঁ নিউজ/এসএ
আরও খবর পড়ুন – চাটগাঁ নিউজ হোমপেজ
![]()
লাইভ আপডেটেড ভিডিও নিউজ দেখতে চোখ রাখুন সিপ্লাস টিভির ইউটিউব চ্যানেলে





