সমুদ্র উত্তাল, আসেনি এলএনজি—আবারও গ্যাস সংকটে চট্টগ্রাম

নিজস্ব প্রতিবেদক : চট্টগ্রামে চলমান গ্যাস-সংকট কাটার আগেই আবারও কমে গেছে সরবরাহ। বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল থেকে নগরের বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতে রান্না ব্যাহত হয়েছে। কোথাও গ্যাসের চাপ এতটাই কম ছিল যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চুলা জ্বলেনি। একই সঙ্গে সিএনজিচালিত যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে ফিলিং স্টেশনগুলোতে। কোথাও কোথাও গ্যাস না থাকায় সাময়িকভাবে ফিলিং স্টেশন বন্ধও রাখতে হয়েছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী ও পরিবহনসংশ্লিষ্টরা।

নগরের মাদারবাড়ি এলাকার বাসিন্দা শিল্পী মজুমদার বলেন, ‘সকাল আটটার পর থেকেই গ্যাস নেই। দুপুর গড়িয়ে গেলেও রান্না করতে পারিনি। ছোট বাচ্চাদের খাবার তৈরি করতেও সমস্যায় পড়েছি।’

শুধু মাদারবাড়ি নয়, আগ্রাবাদ, হালিশহর, চান্দগাঁও, বাকলিয়া, পাহাড়তলী, খুলশী, ডবলমুরিং, হামজারবাগ, পতেঙ্গাসহ নগরের বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে এনেছে, আবার কেউ কেউ বৈদ্যুতিক চুলা বা এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করছেন।

গ্যাস-সংকটের বড় প্রভাব পড়েছে সিএনজি খাতেও। কর্ণফুলী, অক্সিজেন, বহদ্দারহাট, কালুরঘাট ও আগ্রাবাদ এলাকার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে সকাল থেকেই শত শত সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসের দীর্ঘ সারি দেখা যায়।

কর্ণফুলী সিএনজি স্টেশনে সকাল সাতটা থেকে অপেক্ষা করছিলেন অটোরিকশাচালক শাহ আলম। তিনি বলেন, “গ্যাসের চাপ খুবই কম। একটি গাড়িতে গ্যাস দিতে আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগছে। কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক সময় পুরো ট্যাংক ভর্তি করা যাচ্ছে না। এতে আয় কমে যাচ্ছে।”

আরেক চালক মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, “সারাদিন রাস্তায় থাকার বদলে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। যাত্রী পাচ্ছি না, আয়ও অর্ধেকে নেমে এসেছে।”

কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হলেও বুধবার সরবরাহ পাওয়া যেতে পারে মাত্র ১৮ থেকে ১৯ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ দৈনিক চাহিদার প্রায় অর্ধেক গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

কেজিডিসিএলের কর্মকর্তারা জানান, এবারের সংকটের পেছনে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের যান্ত্রিক ত্রুটি নয়, বরং বৈরী আবহাওয়া বড় কারণ। বঙ্গোপসাগরে প্রবল বাতাস ও উত্তাল সমুদ্রের কারণে নতুন এলএনজিবাহী জাহাজ নিরাপদে টার্মিনালে ভিড়তে পারছে না। ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) মো. শোয়েব বলেন, ‘এলএনজিবাহী জাহাজ নিরাপদে টার্মিনালে ভেড়াতে বাতাসের গতি ২০ নটের মধ্যে থাকা প্রয়োজন। বর্তমানে বাতাসের গতি প্রায় ৩৮ নট। নিরাপত্তার কারণে জাহাজটি ভেড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।’

তিনি আরও জানান, বর্তমানে মহেশখালীর দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে ৪০ কোটি ঘনফুটের কিছু বেশি গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে নতুন এলএনজিবাহী জাহাজটি টার্মিনালে ভিড়তে পারলে সরবরাহ বেড়ে প্রায় ৭৫ কোটি ঘনফুটে উন্নীত হবে, যা সংকট অনেকটাই কমিয়ে আনবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে গ্যাসের চাহিদা দিন দিন বাড়লেও দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন কমছে। ফলে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। কিন্তু আবহাওয়া বা প্রযুক্তিগত কোনো সমস্যা দেখা দিলেই সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়, যার প্রভাব প্রথমেই পড়ে শিল্প, পরিবহন ও আবাসিক খাতে।

এর আগে গত ২১ জুলাই মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের বয়লারে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় চট্টগ্রামে ভয়াবহ গ্যাস-সংকট তৈরি হয়েছিল। তখন নগরে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছিল ১৮ থেকে ১৯ কোটি ঘনফুটে। পরে বয়লার চালু করে আংশিকভাবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হলেও সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মঙ্গলবার রাত থেকে আবার সরবরাহ কমে যাওয়ায় বুধবার সকাল থেকেই নতুন করে সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।

সংকটের সময় অতীতের মতো এবারও অনেক চালককে চার থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত ফিলিং স্টেশনের লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কেউ কেউ রাতভর গাড়িতেই অবস্থান করছেন, যাতে পরদিন সকালে গ্যাস নিতে পারেন।

বর্তমানে কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকেই আমদানিকৃত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। স্বাভাবিক সময়ে এসব টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়।

কেজিডিসিএলের কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাস-সংকট কত দ্রুত কাটবে তা পুরোপুরি নির্ভর করছে মহেশখালীর আবহাওয়ার ওপর। বাতাসের গতি কমে এলএনজিবাহী জাহাজটি নিরাপদে টার্মিনালে ভিড়তে পারলেই সরবরাহ বাড়বে। ততদিন পর্যন্ত চট্টগ্রামকে চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেক গ্যাস নিয়েই পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে।

এদিকে দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটে নগরবাসী দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা জোরদার, এলএনজি মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া এ ধরনের সংকট থেকে স্থায়ীভাবে মুক্তি পাওয়া কঠিন হবে।

চাটগাঁ নিউজ/এসএ

Scroll to Top