নিজস্ব প্রতিবেদক : চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ‘ডেভিড ইমন’ অবশেষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জালে ধরা পড়েছেন। বিদেশি মোবাইল নম্বর ও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে ব্যবসায়ীদের কাছে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দাবি, চাঁদা না পেলে সশস্ত্র হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ, লুটপাট ও হত্যার হুমকির অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা এই সন্ত্রাসী ২৯ জুলাই (বুধবার) ভোরে ভারতের উদ্দেশ্যে পালিয়ে যাওয়ার সময় যশোরের ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন।
যশোর জেলা পুলিশ ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের যৌথ অভিযানে ইমনের সঙ্গে তার আরও তিন সহযোগীকেও আটক করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে যশোর কোতোয়ালি থানার ঝুমঝুমপুর এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে অভিযান চালানো হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ইমন স্বীকার করেছেন, সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার।
বিদেশি নম্বর ও হোয়াটসঅ্যাপে পরিচালিত হতো চাঁদাবাজি
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিজের পরিচয় গোপন রাখতে ডেভিড ইমন বিদেশি মোবাইল নম্বর এবং হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করতেন। টার্গেটকৃত ব্যবসায়ী, ঠিকাদার ও প্রতিষ্ঠানের মালিকদের বিদেশি নম্বর থেকে কল দিয়ে কিংবা অডিও বার্তা পাঠিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হতো। এতে ভুক্তভোগীদের পক্ষে কলের উৎস শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ত।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, প্রযুক্তিনির্ভর এই কৌশলের মাধ্যমে তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করছেন—এমন ভয় সৃষ্টি করে প্রভাব বিস্তার করতেন এবং সংগঠিত অপরাধ কার্যক্রম পরিচালনা করতেন।
ডিডিএন ইন্টারনেট অফিসে প্রকাশ্য হামলা
গত ১১ জুলাই চট্টগ্রামের চকবাজার এলাকার ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ডট নেট (ডিডিএন)-এর মালিক আদিল বিন মামুনের কাছে বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে এককালীন ২ কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন ইমন।
চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ১৩ জুলাই দুপুরে তার ৩০ থেকে ৩৫ জন সশস্ত্র অনুসারী ডিডিএন অফিসে হামলা চালায়। হামলাকারীরা অফিসে ব্যাপক ভাঙচুর চালানোর পাশাপাশি কর্মচারীদের বেতনের জন্য রাখা প্রায় ৩৫ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
সাংবাদিককেও দেওয়া হয়েছিল প্রাণনাশের হুমকি
শুধু ব্যবসায়ী নন, একজন সিনিয়র সাংবাদিকও ছিলেন ইমনের চাঁদাবাজির টার্গেট। গত মে মাসে বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে কল করে ওই সাংবাদিকের কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তাকে এবং তার পরিবারের সদস্যদের গুলি করে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এই ঘটনাটি সন্ত্রাসী চক্রটির দুঃসাহসিকতার অন্যতম উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
১০ তলা ভবনে ককটেল হামলা
সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডে এক ব্যবসায়ীর কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে ইমন বাহিনী। দাবি পূরণ না হওয়ায় ওই ব্যবসায়ীর নির্মাণাধীন ১০ তলা ভবনে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয় এবং সশস্ত্র হামলা চালানো হয়। এতে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
‘বড় সাজ্জাদ’ গ্রুপের প্রধান সহযোগী
পুলিশি সূত্রে জানা গেছে, ডেভিড ইমন বিদেশে পলাতক চট্টগ্রামের আরেক কুখ্যাত শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ ওরফে সাজ্জাদ আলী খানের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী। স্থানীয় পর্যায়ে ‘ছোট সাজ্জাদ’ গ্রেপ্তার হওয়ার পর ইমন এবং মোহাম্মদ রায়হান আলম যৌথভাবে এই সন্ত্রাসী চক্রের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। চক্রটির মূল লক্ষ্য ছিল—ডেভেলপার কোম্পানি, ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, ডিশ ব্যবসায়ী, গার্মেন্টস মালিক, খাতুনগঞ্জের আড়তদার, বিভিন্ন শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিক
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র এক মাসেই ইন্টারনেট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এই চক্র দেড় কোটিরও বেশি টাকা চাঁদা আদায় করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
১৮ মামলার আসামি
ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানায় ডবল মার্ডার, সন্ত্রাসী হামলা, চাঁদাবাজি, অস্ত্র ব্যবহার, বিস্ফোরক দ্রব্য আইনসহ কমপক্ষে ১৮টি মামলা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকায় ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সীমান্ত পেরিয়ে পালানোর পরিকল্পনা
তদন্তকারীরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক অভিযান এবং সহযোগীদের গ্রেপ্তারের পর ইমন আত্মগোপনে চলে যান। শেষ পর্যন্ত সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। তবে যশোরে চেকপোস্টে যৌথ অভিযানে সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
পুলিশ এখন তার ব্যবহৃত বিদেশি মোবাইল নম্বর, হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট, আর্থিক লেনদেন, সহযোগী নেটওয়ার্ক এবং অস্ত্রের উৎস নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, তার জিজ্ঞাসাবাদ থেকে সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজ চক্রের আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
পুলিশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ
আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, ডেভিড ইমনের গ্রেপ্তার চট্টগ্রামের সংঘবদ্ধ সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি দমনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হলেও, তার নেতৃত্বাধীন নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ ভেঙে দিতে অর্থের উৎস, অস্ত্র সরবরাহকারী এবং পলাতক গডফাদারদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। অন্যথায় নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে একই চক্র আবারও সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে।
চাটগাঁ নিউজ/এসএ





