চাটগাঁ নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশে পানিতে ডুবে মৃত্যুর পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) একে ‘নীরব মহামারি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। আর দেশের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে উঠে এসেছে চট্টগ্রামের নাম। যেখানে গেল চার বছরে শুধু চট্টগ্রামে পানিতে ডুবে মারা গেছে অন্তত ২৮২ জন। পাহাড়ি ছড়া, সমুদ্রসৈকত, নদী, পুকুর ও বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রের বেশিরভাগ এলাকায় ঘটেছে এসব দুর্ঘটনা। তার মধ্যে নিহতদের একটি বড় অংশই হলো শিশু!
আজ শনিবার (২৫ জুলাই) ‘‘বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস’’ উপলক্ষে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এসব তথ্য তুলে ধরে ‘লাইফ সেভিং সোসাইটি চট্টগ্রাম’। সভায় ট্যুরিস্ট পুলিশ, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অংশ নেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে তিন লাখের বেশি মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। এর প্রায় ৯০ শতাংশ মৃত্যু ঘটে বাংলাদেশসহ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় জাতিসংঘ ও ডব্লিউএইচও ২০২৫ সালে পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে একটি বৈশ্বিক কৌশলপত্র প্রকাশ করেছে। এর লক্ষ্য, ২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ডুবে মৃত্যুর হার ৩৫ শতাংশ কমিয়ে আনা।
এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২১ সাল থেকে প্রতি বছর ২৫ জুলাই ‘বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস’ পালিত হচ্ছে।
এরই অংশ হিসেবে চট্টগ্রামেও পালিত হয় দিবসটি। যেখানে উঠে এসেছে— প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ছড়া, সমুদ্রসৈকত ও বিভিন্ন জলাশয়ে ডুবে মৃত্যুর ঘটনাগুলো বিশেষ করে পর্যটন এলাকাগুলোতে অসচেতনতা, নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি এবং সাঁতার না জানার কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।
ট্যুরিস্ট পুলিশের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডুবে মৃত্যুর প্রায় ৬৫ শতাংশই ৯ বছরের নিচের শিশু। বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিভাবকদের অসতর্কতা, নিরাপদ জলাধারের অভাব এবং শিশুদের সাঁতার না জানা এসব মৃত্যুর অন্যতম কারণ।
জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৮ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যান। ২০২৪ সালের জরিপ অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ৫১ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যার ৭৫ শতাংশের বেশি শিশু। এছাড়া ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মে পর্যন্ত সময়ে প্রায় ৩ হাজার ৫৩৩ জনের ডুবে মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ৩০৯ জনই শিশু।
বিভাগভিত্তিক চিত্রে শীর্ষে চট্টগ্রাম
সংশ্লিষ্ট সংস্থার উপস্থাপিত তথ্যে দেখা গেছে, গত চার বছরে পানিতে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যায় দেশের বিভাগগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে চট্টগ্রাম। এ সময়ে চট্টগ্রামে ২৮২ জন, রংপুরে ১৬০ জন, ঢাকায় ১৪৯ জন, বরিশালে ১৩১ জন, ময়মনসিংহে ১০৪ জন, খুলনায় ১০৩ জন, সিলেটে ৯১ জন এবং রাজশাহীতে ১০ জন মারা গেছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপপ্রবাহ, আকস্মিক বন্যা, অতিবৃষ্টি ও চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ওপর। যুক্তরাজ্যে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবেশের তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার গড়ে ৭ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
ঝুঁকিতে শিশুরা
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বজুড়ে ৫ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের অকালমৃত্যুর শীর্ষ ১০টি কারণের একটি হলো পানিতে ডুবে মৃত্যু। নদী, খাল, পুকুর, উন্মুক্ত কূপ, জলাধার এমনকি বাড়ির পানির সংরক্ষণ পাত্রেও শিশুরা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। বন্যা ও ঝড়ের সময় এ ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, পানিতে ডুবে মৃত্যুর প্রায় ৯০ শতাংশই প্রতিরোধযোগ্য। এজন্য প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার এবং শিশুদের সাঁতার শেখানোর উদ্যোগ।
বিশেষজ্ঞরা পানিতে ডুবে মৃত্যু কমাতে কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেন। যেগুলোর মধ্যে রয়েছে—শিশুদের কখনোই পানির ধারে একা যেতে না দেওয়া, ছোটবেলা থেকেই সাঁতার শেখানো, লাইফগার্ড থাকা স্থানে সাঁতার কাটা, নদী, খাল বা সমুদ্রে চলাচলের সময় লাইফজ্যাকেট ব্যবহার, দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দল বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়া, প্রাথমিক শিক্ষায় সাঁতার শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপদ জলাধার ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি জোরদার করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পানিতে ডুবে মৃত্যু কোনো অনিবার্য নিয়তি নয়; এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য জনস্বাস্থ্য সমস্যা। সমন্বিত উদ্যোগ, কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো গেলে চট্টগ্রামসহ সারা দেশে প্রতি বছর শত শত প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব।
চাটগাঁ নিউজ/জেএইচ






