চাটগাঁ নিউজ ডেস্ক : চট্টগ্রাম নগরের টাইগারপাস–লালখান বাজার এলাকায় গ্রাফিতি মুছে ফেলা নিয়ে বিএনপি ও এনসিপি’র নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের পাশাপাশি উভয় পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে বাগবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)।
সোমবার (১৮ মে) সকাল থেকে টাইগারপাস, লালখান বাজারসহ আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত সতর্ক অবস্থানে দেখা যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও পয়েন্টে পুলিশ সদস্যদের টহল জোরদার করা হয়, ফলে এলাকায় জনমনে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করে।
এর আগে জিইসি মোড় থেকে দেওয়ানহাট পর্যন্ত প্রধান সড়ক ও আশপাশের এলাকায় সব ধরনের জনসমাবেশ, মিছিল ও সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে সিএমপি।
তবে এই নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই বেলা পৌনে দুইটার দিকে টাইগারপাসে শহীদ ওয়াসিম আকরাম এক্সপ্রেসওয়ের পিলারে গ্রাফিতি আঁকার জন্য জড়ো হন একদল তরুণ-তরুণী। তাঁরা নিজেদের ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ ও ‘জুলাইযোদ্ধা’ পরিচয় দেন। তাঁরা গ্রাফিতি আঁকার চেষ্টা করলে পুলিশ তাঁদের বাধা দেয়। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি হয়। একপর্যায়ে রঙের কৌটা নিয়েও উভয় পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়েছে। এ সময় পুলিশ সদস্য ও গ্রাফিতি আঁকতে যাওয়া তরুণ-তরুণীদের গায়ে রং ছড়িয়ে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ তিনজনকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময় সঙ্গে আসা বাকি তরুণ-তরুণীরা পুলিশকে বাধা দেন। একপর্যায়ে আটকের প্রতিবাদে সড়কের ওপর বসে থাকতে দেখা যায় কয়েকজনকে।
জানতে চাইলে খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনিসুর রহমান বলেন, ঘটনাস্থল থেকে তিনজনকে আটক করা হয়েছিল, তবে পরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
জানা যায়, টাইগারপাস এলাকায় এলিভেটেড এক্সপ্রেওয়ের পিলারে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য রং করা হয়। বিষয়টি নজরে আসলে এনসিপি’র পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, জুলাই গ্রাফিতি মুছে দিয়ে মেয়র পিলারে রং করেছেন। এ নিয়ে উভয়পক্ষের নেতাকর্মীরা ফেসবুকে স্ট্যাটাস ও লাইভে একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। এ ইস্যুতে গতকাল রবিবার রাতেই বিক্ষোভ মিছিল করে এনসিপি’র নেতা-কর্মীরা। এসময় রং করা পিলারে মেয়র শাহাদাত ও জুলাই নিয়ে বিভিন্ন গ্রাফিতি অঙ্কন করা হয়।

এ বিষয়ে মহানগর এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. এম আর রহমান মাবরুর বলেন, শহীদের স্মৃতিবাহী দেয়ালচিত্র মুছে ফেলে বাণিজ্যিক ব্যবহারের উদ্যোগ জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ও অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, জনগণের আবেগ ও ইতিহাসের চেয়ে কার স্বার্থকে এখানে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে?
মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান বলেন, বিএনপি জুলাইকে ধারণ করে। সুতরাং বিএনপি এই সমস্ত কাজে জড়িত নয়।
এনসিপির বিবৃতি
টাইগারপাস এলাকায় জুলাই আন্দোলনের স্মারক গ্রাফিতি অপসারণের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি। সংগঠনটির দাবি, এসব গ্রাফিতি শুধু দেয়ালচিত্র নয়, বরং জুলাই আন্দোলনের আত্মত্যাগ, গণমানুষের আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিবাদী চেতনার প্রতীক। এগুলো অপসারণ করে বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন স্থাপনের উদ্যোগ জনমনে ক্ষোভ ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, গ্রাফিতি মুছে ফেলার পর এনসিসিপি ও জুলাইয়ের সহযোদ্ধারা পুনরায় দেয়ালচিত্র আঁকার উদ্যোগ নিলে কিছু বিএনপি নেতা-কর্মী তাতে বাধা দেন। অথচ পুরো সময়জুড়ে কোথাও যানচলাচল বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেনি। দেয়াল থেকে গ্রাফিতি মুছে ফেলা গেলেও মানুষের হৃদয় থেকে জুলাইয়ের স্মৃতি মুছে ফেলা যাবে না। জনগণের আবেগ, শহীদদের স্মৃতি ও ঐতিহাসিক প্রতীককে রাজনৈতিক সংকীর্ণতার উপকরণে পরিণত না করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
গ্রাফিতি মুছে ফেলার বিষয় নিয়ে সোমবার (১৮ মে) নিজ কার্যালয়ে কথা বলেন চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় তরুণরা যে ত্যাগ স্বীকার করেছে, তা শুধু মুখে বললে হবে না, বরং অন্তর থেকে ধারণ করতে হবে।
তিনি বলেন, আজ অনেকে গ্রাফিতি বা নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা করলেও আহত জুলাই যোদ্ধা ও তাদের পরিবারের কষ্টের কথা খুব কম মানুষই ভাবছে। গত ৩ আগস্ট আমার নিজের বাড়িতে আগুন ও বোমা হামলা চালানো হয়েছিল। সেখানে গ্যাস চেম্বার তৈরি করে হামলার ঘটনাও ঘটে এবং বৃদ্ধা মাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। ড্রাইভারের সাহসিকতায় পুরো ভবন পুড়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পায়।
এছাড়া ৪ আগস্ট আহত জুলাই যোদ্ধাদের হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়া হলে তাদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন বলেও জানান তিনি। বলেন, ‘৬ আগস্ট চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে গিয়ে আহতদের ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক সহায়তা দিয়েছি। আর্ট কলেজের শিক্ষার্থীদের দিয়ে নান্দনিক গ্রাফিতি অঙ্কন করা হবে। চসিক যদি টাকা দিতে না পারে, তাহলে আমার পকেটের টাকায় এটি বাস্তবায়ন করবো’।
চাটগাঁ নিউজ/এসএ






