গৃহকর নিয়ে মুখোমুখি চট্টগ্রাম বন্দর-চসিক, পাঁচ বৈঠকেও মেলেনি সমাধান

চাটগাঁ নিউজ ডেস্ক : চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা গৃহকরসংক্রান্ত বিরোধ এখনো নিষ্পত্তির মুখ দেখেনি। এ বিষয়ে গঠিত যৌথ জরিপ কমিটি ইতোমধ্যে পাঁচ দফা বৈঠক করলেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি দুই পক্ষ।

এরই মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বার্ষিক গৃহকর প্রায় ২২০ কোটি টাকা বাড়িয়ে ২৬৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা নির্ধারণ করেছে চসিক। অথচ এতদিন বন্দর কর্তৃপক্ষ বছরে ৪৫ কোটি টাকা করে গৃহকর পরিশোধ করে আসছিল।

এ বিষয়ে গত ৩ মে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে আপিল শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে মেয়র শাহাদাত হোসেনের উপস্থিতিতে নতুন গৃহকর নির্ধারণ করা হয়। পরদিন ৪ মে বন্দর কর্তৃপক্ষকে তা পরিশোধের জন্য নোটিশ দেয় চসিক।

চসিক মেয়র শাহাদাত হোসেন দাবি করেন, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বন্দর কর্তৃপক্ষ নতুন নির্ধারিত গৃহকর পরিশোধে জটিলতা সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, নগরের সড়কগুলো সর্বোচ্চ ১০ টন ধারণক্ষমতার হলেও বন্দরের ৪০ থেকে ৫০ টনের ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে রাস্তা ও সেতুর ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। সিটি করপোরেশন এসব ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দাবি না করলেও গৃহকর খাতে ন্যায্য পাওনা আদায় করতে পারছে না।

অন্যদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা সিটি করপোরেশনের নোটিশ পেয়েছে এবং বিধি অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম চলছে। তবে গৃহকরসংক্রান্ত বিরোধের জেরে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে কর পরিশোধ বন্ধ রেখেছে সংস্থাটি। যদিও একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে চসিককে সবচেয়ে বেশি গৃহকর দিয়ে থাকে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

চসিক সূত্র জানায়, সর্বশেষ ২০১৬-১৭ অর্থবছরের পঞ্চবার্ষিক কর পুনর্মূল্যায়নে বন্দরের গৃহকর ১৬০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে বন্দরের আপত্তির পর সাবেক মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর সময় তা কমিয়ে ৪৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে গত বছরের ৩ নভেম্বর দায়িত্ব নেওয়ার পর মেয়র শাহাদাত হোসেন পুনরায় ১৬০ কোটি টাকা হারে গৃহকর আদায়ের উদ্যোগ নেন।

বিরোধ নিষ্পত্তিতে গত বছরের ১৪ আগস্ট আট সদস্যের একটি যৌথ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির আহ্বায়ক করা হয় বন্দর পরিচালনা পর্ষদের সদস্য মাহবুবুল আলম তালুকদারকে এবং সদস্য সচিব করা হয় চসিক সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিনকে। যৌথ জরিপে বন্দরের ১ কোটি ৭৩ লাখ বর্গফুট স্থাপনার বিপরীতে ২৬৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা গৃহকর নির্ধারণ করে চসিক। যদিও স্থাপনার আয়তন নিয়ে একমত হলেও গৃহকরের পরিমাণ নিয়ে একমত হয়নি বন্দর কর্তৃপক্ষ।

এদিকে গৃহকর পরিশোধ বিষয়ে নির্দেশনা চেয়ে গত ১৩ এপ্রিল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। পরে ২২ এপ্রিল মন্ত্রণালয়ের জবাবে বলা হয়, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন (ট্যাক্সেশন) রুলস, ১৯৮৬ অনুযায়ী গৃহকর নির্ধারণের এখতিয়ার চসিকের। এ বিষয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কোনো এখতিয়ার নেই বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে চসিক নির্ধারিত গৃহকর পরিশোধের নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এর আগে গত ২২ এপ্রিল প্রথম দফায় ২৬৪ কোটি টাকা গৃহকর পরিশোধের নোটিশ দেয় চসিক। এর বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে ২৮ এপ্রিল আপিল করে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

আপিল আবেদনে বন্দর কর্তৃপক্ষ দাবি করে, মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন রুলস, ১৯৮৬ অনুযায়ী সঠিকভাবে গৃহকর নির্ধারণ করা হয়নি। যৌথ জরিপ অনুযায়ী তাদের গৃহকর হওয়া উচিত ১৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। অথচ বর্তমানে তারা এর তিন গুণেরও বেশি কর দিচ্ছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষ আরও উল্লেখ করে, প্রতি পাঁচ বছর অন্তর গৃহকর পুনর্নির্ধারণের বিধান রয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য ১৬০ কোটি ১৬ লাখ টাকা দাবি করা হলেও পরবর্তী বৈঠকে ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে বার্ষিক ৪৫ কোটি টাকা গৃহকর নির্ধারণে দুই পক্ষ সম্মত হয়েছিল। ফলে নতুন করে গৃহকর নির্ধারণ করা হলে তা ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে কার্যকর হওয়া উচিত বলে দাবি তাদের।

কমিটির আহ্বায়ক ও বন্দর পরিচালনা পর্ষদ সদস্য মাহবুবুল আলম তালুকদার বলেন, গৃহকর ইস্যুতে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আলোচনা চলছে। বিধি অনুযায়ী সিটি করপোরেশনকে অর্থ পরিশোধ করা হবে।

কমিটির সদস্য সচিব ও চসিক সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন বলেন, যৌথ জরিপের ভিত্তিতে বন্দরের বার্ষিক গৃহকর নির্ধারণ করা হয়েছে ২৬৪ কোটি টাকা। ২০১৭ সালের মূল্যায়ন অনুযায়ী চসিকের পাওনা ১৬০ কোটি টাকার বিপরীতে বন্দর পরিশোধ করেছে ১৪৫ কোটি টাকা। এর কম পরিশোধের সুযোগ নেই। আপত্তি থাকলে বন্দর কর্তৃপক্ষ আপিল করতে পারে।

চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস এম সরওয়ার কামাল বলেন, শুনানিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ আবার কর পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানালেও বিধি অনুযায়ী সেই সুযোগ নেই। নির্ধারিত গৃহকর নিয়ে আপত্তি থাকলে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আপিল করা যাবে। তবে সেক্ষেত্রে নির্ধারিত করের ৭৫ শতাংশ আগে জমা দিতে হবে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্বে) সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, বার্ষিক ২৬৪ কোটি টাকার গৃহকরের নোটিশ তারা পেয়েছেন। এ বিষয়ে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

চাটগাঁ নিউজ/এসএ

Scroll to Top