চাটগাঁ নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের বিএনপি শাসনামলের ‘অন্ধকার দিনগুলো’ ফিরে আসতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এমন আশঙ্কার কারণ হিসেবে দেশে জঙ্গি ও উগ্রপন্থি শক্তির উত্থানের কথা বলেছেন তিনি। আর নিজের দেশে ফেরা প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেছেন, ‘শিগগিরই ফিরবেন’।
ইমেইলে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা এসব আশঙ্কা ও সম্ভাবনার কথা শুনিয়েছেন বলে হিন্দুস্তান টাইমসের খবরে বলা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। এরপর থেকে তিনি ভারতের রাজধানী দিল্লিতে অবস্থান করছেন।
গতবছর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ড হয় শেখ হাসিনার। বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে দুর্নীতির একাধিক মামলাতে।
এর আগে গেল বছরের মে মাসে আওয়ামী লীগের সব ধরনের কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। একই মাসে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধনও স্থগিত করা হয় তাদের।
এমন প্রেক্ষাপটে ‘শিগগিরই’ ফেরার আশা শোনালেও সেটা যে দেশের ‘গণতান্ত্রিক পরিবেশ’ পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর নির্ভর করছে, সেটাও মানছেন শেখ হাসিনা।
হিন্দুস্তান টাইমসে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারটি নিচে তুলে ধরা হলো—
আপনি এর আগে ১৯৮১ সালের ১৭ মে নির্বাসন শেষে ভারত থেকে দেশে ফিরেছিলেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আপনি কি শিগগিরই দেশে ফেরার সম্ভাবনা দেখছেন?
১৭ মে আমার জন্য আবেগঘন ও স্মরণীয় একটি দিন। বাবা-মা, ভাই ও স্বজনদের হারিয়ে ১৯৮১ সালের এই দিনে ছয় বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরেছিলাম। সেই ফেরার ভিত্তি ছিল দেশের মানুষের ভালোবাসা। আর তখনও আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ছিল, মামলা ছিল ও জীবনের ঝুঁকি ছিল।
ফেরার বিষয়টি নির্দিষ্ট দিনক্ষণের ওপর নির্ভর করে না। আমরা দেশে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক অধিকার ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছি।
এসব বিষয় পুনঃপ্রতিষ্ঠা হওয়াটা শুধু আমার ফেরার জন্য জরুরি নয়, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিতেও জরুরি। দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে শিগগিরই সেই লক্ষ্যে পৌঁছাব।
আরেকটা বিষয় আমি স্পষ্ট করতে চাই। সেটা হলো, আমার অনুপস্থিতি মানেই আমার নীরবতা নয়। প্রতিটি মুহূর্তে আমি দেশের জন্য লড়াই করছি এবং কূটনৈতিক পর্যায়ে, আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর মধ্যে এবং বৈশ্বিক গণমাধ্যমের মাধ্যমে আমরা কাজ করছি।
১৯ বার হত্যাচেষ্টা থেকে আমি প্রাণে রক্ষা পেয়েছি। আমাকে কোনো কিছুই থামাতে পারেনি। আল্লাহ যেহেতু আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, তাই আমি খুব শিগগিরই দেশের মাটিতে ফিরব।
আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আপনার বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা। এর পরও কি আপনার দেশে ফেরা সম্ভব?
আওয়ামী লীগ জনগণের দল; বন্দুকের নল কিংবা ক্ষমতাবানদের আশীর্বাদে এ দলের জন্ম নেয়নি। কাগজে লেখা কোনো নিষেধাজ্ঞাই আওয়ামী লীগকে দমাতে পারবে না। নিষেধাজ্ঞায় যদি আওয়ামী লীগকে দমন করা যেত, তাহলে বাংলাদেশই জন্ম নিত না।
আওয়ামী লীগ আগের চেয়ে আরো বেশি শক্তি নিয়ে রাজনীতিতে বারবার ফিরে এসেছে। যারা ভাবছেন এই নিষেধাজ্ঞা স্থায়ী, তাদের ইতিহাসের পাতা দেখা উচিত।
এই নিষেধাজ্ঞা হয়ত ক্ষমতাসীনদের সাময়িক ক্ষমতা প্রয়োগের প্রতিফলন, কিন্তু এটি মূলত তাদের ভয়ের বহিঃপ্রকাশ; তারা আওয়ামী লীগকে ভয় পায়।
আমাদের লাখ লাখ সমর্থক এবং হাজার হাজার নেতাকর্মী এখনও দেশে অবস্থান করছেন। হামলা, মামলা, কারাবরণ ও নির্যাতনের পরও তারা ঐক্যবদ্ধ। দেশ ও জনগণের স্বার্থে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন অবশ্যম্ভাবী, এটি কেবল সময়ের ব্যাপার।
বাংলাদেশের কোনো কোনো নেতা ইঙ্গিত দিয়েছেন, ‘শেখ হাসিনা বিহীন আওয়ামী লীগ’ মেনে নেওয়া হতে পারে। এ অবস্থায় কি দল পুনর্গঠন ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে?
আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক একটি দল। দলের আদর্শ ধারণ করা নেতাকর্মীরাই এর প্রাণ; তারাই নেতৃত্ব নির্বাচন করে থাকেন। আপনি একে সংস্কার বা সমন্বয় যাই বলুন না কেন, এটি একটি স্বাভাবিক ও চলমান প্রক্রিয়া।
আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল। ফলে কিছু ক্ষেত্রে দলের নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বা সমালোচনা থাকতে পারে। কিন্তু দল হিসেবে আওয়ামী লীগ কখনো কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয় না।
আবার এটাও মাথায় রাখতে হবে, শুদ্ধি অভিযান বা বিপ্লবের নামে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা প্রায়ই প্রতিদ্বন্দ্বী দলকে ভেঙে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করে।
আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, আওয়ামী লীগের নিজের ঘর গোছানোর সক্ষমতা রয়েছে। আর গোছানোর কাজটি হবে দলের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে, ষড়যন্ত্রকারীদের পরামর্শে নয়।
আওয়ামী লীগের আরো যেসব নেতা দেশ ছেড়েছেন, তারাও কি দেশে ফিরবেন?
দেশ ছেড়ে গেছেন— এই বাক্যের সঙ্গে আমি একমত নই। কারণ হলো, কেউই নিজের ইচ্ছায় দেশ ছাড়েননি। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন ‘অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার’ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে এক ধরনের ‘নীরব রাজনৈতিক গণহত্যা’ চালিয়েছে। এই ‘গণহত্যা’ এখনও চলছে।
আমাদের প্রায় ৬০০ নেতাকর্মীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে দেড় লাখের বেশি নেতাকর্মীকে। অনেকের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভাঙচুর হয়েছে; দখল হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী এবং আওয়ামী লীগের আদর্শ ধারণ করায় হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। দেশ ছাড়লেও তাদের অনেকে দলকে সংগঠিত করা এবং আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের কাজ করছেন।
আমি এটাই বলতে চাই, দেশে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও আইনের শাসন ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে তারা দেশে ফিরবেন।
বাংলাদেশ একটি ‘অর্থনৈতিক সংকটের’ মুখোমুখি। এটি যেভাবে সামলানো হচ্ছে, সে বিষয়ে আপনার ভাবনা কী?
ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বৈষম্যমুক্ত সমৃদ্ধ দেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ২০০৮ সালের পর আওয়ামী লীগের চার মেয়াদে আমরা বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিলাম।
আমরা পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দরের মতো বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি।
২০০৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের শেষ বাজেট ছিল ৭০ হাজার কোটি টাকার। তখন মাথাপিছু আয় ছিল ৪৮২ ডলার; আর দেশের জিডিপির আকার ছিল ৭০ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে আমরা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সর্বশেষ বাজেট দিয়েছিলাম, তার আকার ছিল ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ৭৮৪ ডলার আর জিডিপির আকার ছিল ৪৫০ বিলিয়ন ডলার।
ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করে দিয়েছে। ‘মব ভায়োলেন্সের’ মাধ্যমে বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির কারণে তলানিতে নেমে এসেছে বিদেশি বিনিয়োগ।
মাত্র দেড় বছরে তারা অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি উৎস থেকে ৩ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারেও এই ধারা অব্যাহত আছে। বর্তমান সরকার মাত্র তিন মাসে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার, এমনকি বিএনপির সময়ও চীন ও পাকিস্তানের প্রতি বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। অন্যদিকে ভারতবিরোধী বক্তব্য বেড়েছে। এটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল নীতি হলো, ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’। এই বন্ধুত্বের প্রধান উদ্দেশ্য হলো জনগণের কল্যাণ। আমাদের সংবিধানেও এই নীতির কথা বলা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকার সবসময় সব বন্ধুভাবাপন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে স্বচ্ছ, বিশ্বস্ত ও স্বাভাবিক সম্পর্ক ধরে রেখেছে। বিপরীতে অন্যরাও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। ভারত শুধু প্রতিবেশীই রাষ্ট্রই নয়, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তাদের যে অবদান, তা অনস্বীকার্য। কিন্তু আমাদের দেশে স্বাধীনতাবিরোধী এবং আদর্শিকভাবে দেউলিয়া গোষ্ঠীর প্রধান হাতিয়ার হলো ভারতবিরোধী বক্তব্য। ইউনূসের সরকারও এই চর্চায় যোগ দিয়েছিল।
আমাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা সব সময় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ভারতের কাছে ‘দেশ বিক্রি’ করার এবং ‘দেশবিরোধী চুক্তি করার’ অভিযোগ তুলত। অথচ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমান সরকারের অধীনে আমরা দেখছি, বাংলাদেশের স্বার্থ বারবার বলি দেওয়া হচ্ছে।
উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ কেবল বাংলাদেশের জন্যই নয়, এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সরকারের সময় বাংলাদেশ জঙ্গিবাদের ‘চারণভূমিতে’ পরিণত হয়েছিল।
দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে বোমা হামলা হয়েছিল এবং আমার ওপর গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল। বিচারকদের হত্যা করা হয়েছিল; হামলা চালানো হয়েছিল সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ১০ ট্রাক অবৈধ অস্ত্র চোরাচালানের মতো ঘটনাও ঘটেছিল।
ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করে। একই সঙ্গে দেশকে উগ্রবাদমুক্ত করতে সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে দেখেছি, সাজাপ্রাপ্ত জঙ্গিদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে। জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসে জড়িত অনেক সংসদে প্রবেশ করেছেন। ২০০১-০৬ সালের সেই অন্ধকার দিনগুলো আবারও ফিরে আসার উপক্রম হয়েছে।
সূত্র: বিডিনিউজ
চাটগাঁ নিউজ/জেএইচ





