নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রথমবারের মতো দেশে সিএন্ডএফ ব্যবসা করতে নানা বয়সী প্রার্থীরা অংশ নিয়েছিলো ৩ ঘণ্টার লিখিত পরীক্ষায়। পরীক্ষা শেষে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ফলাফল প্রকাশের নিয়ম থাকলেও সপ্তাহ শেষেও সেই ফলাফল প্রকাশ করতে পারেনি চট্টগ্রাম কাস্টমস ট্রেনিং একাডেমি। প্রাথমিক বাছাই ফল চলে গেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর কোর্টে। তবে এনবিআর সূত্র বলছে, পরীক্ষার্থীদের উত্তরপত্র এখন তাদের হাতে নেই। এটি এখন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে! ফলে শঙ্কা জেগেছে আদৌ এই ফলাফল প্রকাশ হবে কি না? এতোদূর কেন যেতে হলো? এমন প্রশ্নের নিজস্ব উত্তর দিয়েছে কাস্টমস কাজের সাথে জড়িত অনেকে। সবার মোদ্দা কথা, তদবির বাণিজ্য সামলাতে না পারায় তা ঢাকা চলে যেতে হলো। সেখানেও তদবির সামলাতে না পেরে অর্থমন্ত্রী হয়ে পাঠিয়ে দেয়া হলো প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে। ২৪ ঘন্টার ফলাফল এখন অজানা তারিখের দিন গুণছে!
আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে সেবার মান উন্নয়ন ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাস্টমস ক্লিয়ারিং এন্ড ফরওয়ার্ডিং (সিএন্ডএফ) এজেন্ট লাইসেন্স প্রদানের লক্ষ্যে গত ১৬ মে চট্টগ্রাম কাস্টমস ট্রেনিং একাডেমির তত্ত্বাবধানে নগরীর খুলশিতে অবস্থিত ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কেন্দ্রিয়ভাবে অনুষ্ঠিত হয় এই পরীক্ষা। যেখানে সারাদেশ থেকে অংশগ্রহণ করেন ২ হাজার ৫২১ জন। যদিও আবেদন জমা পড়েছিল প্রায় ৩ হাজার ৫৯টি। লাইসেন্স পরীক্ষায় আবেদনের জন্য প্রত্যেককে ৫ হাজার টাকা সরকারি ফান্ডে জমা দিতে হয়েছে। সে হিসেবে ৩ হাজার ৫৯ আবেদনকারীর কাছে রাজস্ব বোর্ড এক কোটি ৫৩ লাখ টাকা আয় করেছে। এই টাকা থেকে পুরো পরীক্ষা কার্যক্রমে খরচ হবে। বাকিটা সরকারি কোষাগারে জমা হবে। উত্তীর্ণ আবেদনকারী পাঁচ লাখ টাকার জামানত দিয়েই লাইসেন্স পাবেন। আর আবেদনের জন্য ন্যূনতম ডিগ্রি পাশ হতে হবে।

সিএন্ডএফ সূত্র বলছে, লাইসেন্স পেতে এবার আবেদন করেছেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যারিস্টার থেকে শুরু করে এমপি-মন্ত্রীদের স্ত্রী-সন্তান ও আত্মীয় স্বজন। পাশাপাশি রয়েছেন কাস্টমস কর্মকর্তাদের ঘনিষ্টজন। ফলে যে উদ্দেশ্যে এই লাইসেন্স প্রদানের এত আয়োজন সেখানে পেশাদারিত্ব বজায় রেখে তারা আদৌ সেবা দিতে পারবেন কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন একাধিক অভিজ্ঞ সিএন্ডএফ এজেন্ট। আবার এমপি-মন্ত্রী ঘনিষ্টদের লাইসেন্স পাইয়ে দিতে ফলাফল প্রকাশে বিলম্ব হচ্ছে বলেও দাবি করেন তারা।
এদিকে, কেউ কেউ বলছেন সিএন্ডএফ লাইসেন্স পেতে চলছে ব্যাপক টাকার খেলা। যেখানে লাইসেন্স পাইয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতি আবেদনকারীর কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে ১৫-২০ লাখ টাকা। যারা নিজেদেরকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদের ঘনিষ্ট রাজনৈতিক দল বিএনপি নেতাকর্মী হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। মূলত লাইসেন্স প্রাপ্তির দেন দরবার ঠিক না হওয়ায় ফলাফল প্রকাশে বিলম্ব করছে বলে অভিযোগ লাইসেন্সের পরীক্ষা দেওয়া একাধিক পরীক্ষার্থীর।
ফলাফল বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস এসোসিয়েশনের সভাপতি এস. এম. সাইফুল আলম চাটগাঁ নিউজকে বলেন, ফলাফল দিতে এত বিলম্ব কেন সেটা আমারও বোধগম্য নয়। শুনেছি ৯০ জনের মতো চট্টগ্রামের বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অফিসাররা উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেছেন। এখন ফলাফল না দেয়ায় বিভিন্নরকম কথা উঠছে। আমিও চাই দ্রুত ফলাফল প্রকাশিত হোক।
লাইসেন্স প্রদান কমিটির প্রধান চট্টগ্রাম কাস্টমস ট্রেনিং একাডেমির মহাপরিচালক ম. সফিউজ্জামান চাটগাঁ নিউজকে জানান, এবারের বৈশিষ্ট হচ্ছে সারাদেশের আবেদনকারীরা একস্থানে তিন ঘণ্টার লিখিত পরীক্ষা দিয়েছেন। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণরা পরে মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবেন। সেখানে উত্তীর্ণ হওয়ার পরেই কাস্টমসে কাজের সুযোগ পাবেন।
ফলাফল প্রকাশে বিলম্বের বিষয়ে তিনি জানান, এটি এখন কাস্টমস কমিশনার এবং আহবায়ক হিসেবে আমার হাতে নেই। নানা কারণে চলে গেছে এনবিআরের হাতে। তারাই আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল প্রকাশ করবেন। এর চেয়ে বেশি কিছু জানতে চাইলে তিনি অপারগতা প্রকাশ করে ফোন রেখে দেন।
তবে এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, ফলাফল প্রথমে অর্থ মন্ত্রণালয়ে গেলেও এখন তা প্রধানমন্ত্রী দপ্তরে রয়েছে। সেখান থেকেই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। এবার ২ হাজার ৫২১ জন পরীক্ষা দিলেও পাশের হার প্রায় ৯ শতাংশ এর নীচে বলে নানা বিশ্বস্থ সূত্র থেকে জানা গেছে। সে হিসেবে ধরা যেতে পারে উত্তীর্ণ হয়েছেন কেবল ২২৭ জন। তবে এনবিআর বলছে, ২০০ জনের বেশি লাইসেন্স প্রদান করার সম্ভাবনা খুব কম।
এনবিআর আরও জানায়, কাস্টমস আইন- ২০২৩ এর ধারা-২৪৩ অনুসরণে নতুন কাস্টমস ক্লিয়ারিং এন্ড ফরোয়ার্ডিং (সিএন্ডএফ) এজেন্ট লাইসেন্সি বিধিমালা, ২০২৬ প্রণয়ন করা হয়েছে। এর ফলে আগের কাস্টমস এজেন্ট লাইসেন্সিং বিধিমালা, ২০২০ রহিত হয়েছে। স্বতন্ত্র এই বিধিমালার মাধ্যমে সিএন্ডএফ এজেন্টদের কার্যক্রম আরও সহজ ও যুগোপযোগী করা হবে।

উল্লেখ্য, এর আগে সিএন্ডএফ এজেন্ট লাইসেন্স প্রদানের জন্য কোনো স্বতন্ত্র বিধিমালা ছিল না। কাস্টমস এজেন্ট লাইসেন্সিং বিধিমালা, ২০২০ মোতাবেক কাস্টমস ক্লিয়ারিং এন্ড ফরোয়ার্ডিং (সিএন্ডএফ) এজেন্ট লাইসেন্স ইস্যু করা হতো। সিএন্ডএফ এজেন্টের কার্যক্রম পরিচালনা সহজতর ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে স্বতন্ত্র সিএন্ডএফ এজেন্ট লাইসেন্সিং বিধিমালা, ২০২৬ প্রণয়ন করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, আমদানি-রপ্তানি পণ্য ছাড় করতে প্রতিদিন ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার বিল জমা পড়ে। এসব বিলের বিপরিতে দিনে আড়াইশ কোটি টাকার রাজস্ব পায় কাস্টমস। আমদানি-রপ্তানিকারকের প্রতিনিধি হিসেবে সেই পুরো কাজ করেন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট। আর পণ্যছাড় শেষে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কমিশন পান এজেন্টরা। প্রথম ৫ লাখের জন্য ১ শতাংশ। পরবর্তী ৫ লাখের জন্য ০.৭৫ শতাংশ, তার পরবর্তী ৫ লাখের জন্য ০.৫০ শতাংশ। এরপর থেকে ০.২৫ শতাংশ হারে কমিশন পাবে।
যদিও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বলেন, নতুন লাইসেন্স দেওয়ার বিরোধিতা করছে খোদ চট্টগ্রাম সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস এসোসিয়েশন। নতুন লাইসেন্স দেয়ার কার্যক্রম স্থগিতের দাবি জানিয়ে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস এসোসিয়েশন গত ৬ মে রাজস্ব বোর্ডকে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি দিয়েছিলো।
তবে সংগঠনের বেশ কয়েকজন নেতৃবৃন্দ জানান, ১৯৯৯ সালের পর নতুন লাইসেন্স দেয়া হয়নি এটা ঠিক। চট্টগ্রাম কাস্টমসে ২ হাজার ৯০০ লাইসেন্সের মধ্যে সচল আছে মাত্র ৪০০। বাকিরা কাজ করে মাসে-ছমাসে দুটি। কাজ নেই বলেই তো বাকিরা বসে আছে। নতুন লাইসেন্স দেয়ার এ ঘটনা অসুস্থ প্রতিযোগিতা ছাড়া আর কিছুই না।
চাটগাঁ নিউজ/জেএইচ





