নিজস্ব প্রতিবেদক : চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটে অবস্থিত ঐতিহাসিক জলিল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড। একসময় যেখানে দিন-রাত সুতা ও কাপড় তৈরির যন্ত্রপাতির শব্দ শোনা যেত, সেই বিশাল প্রাঙ্গণ এবার রূপ নিতে যাচ্ছে দেশের অন্যতম প্রধান প্রতিরক্ষা উৎপাদন কেন্দ্রে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত এই মিলটির প্রায় ৫৫ একর জমি ও স্থাপনা এখন ব্যবহার করা হবে বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানার (বিওএফ) সম্প্রসারণ এবং অত্যাধুনিক অস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদনের কাজে।
এ লক্ষ্যে আগামীকাল বৃহস্পতিবার মিল প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাথে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর ও হস্তান্তর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
এর আগে, গত ১ জুলাই অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ‘অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’র বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বস্ত্রকল করপোরেশনের (বিটিএমসি) এই সম্পত্তি প্রতীকী মূল্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের লক্ষ্যে এটি একটি বড় কৌশলগত পদক্ষেপ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঐতিহাসিক বস্ত্রকলের পটভূমি ১৯৬১ সালে ফৌজদারহাটের সীতাকুণ্ড এলাকায় বেসরকারি উদ্যোগে মেসার্স জলিল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড স্থাপিত হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশে মিলটি জাতীয়করণ করে বাংলাদেশ বস্ত্রকল করপোরেশনের (বিটিএমসি) অধীনে নেওয়া হয়। বস্ত্র খাতে একসময় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও নানাবিধ লোকসান ও অব্যবস্থাপনার কারণে পরবর্তীতে মিলটির উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
চট্টগ্রামে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমরাস্ত্র হাব
বর্তমানে বাংলাদেশের একমাত্র মূল সমরাস্ত্র কারখানাটি গাজীপুর সেনানিবাসে অবস্থিত। দেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক এবং বন্দর নগরীর কৌশলগত লজিস্টিক সুবিধার কথা বিবেচনা করে দীর্ঘদিন ধরেই চট্টগ্রামে একটি সমরাস্ত্র প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা করছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। জলিল টেক্সটাইলের এই জমিটি পাওয়ার মাধ্যমে চট্টগ্রামে দেশের দ্বিতীয় প্রধান সমরাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলার পথ সুগম হলো।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন সম্প্রসারিত কারখানায় আধুনিক হালকা ও ভারী সমরাস্ত্র, নিউ-জেনারেশন গোলাবারুদ, আর্টিলারি ফিউজ এবং উন্নত মানের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরি করা হবে। এছাড়া বিদেশি উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এখানে বিশেষায়িত সমরাস্ত্র তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।শ্রমিকদের পাওনা আদায়ের দাবিএদিকে মিলের জমি সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই সাবেক শ্রমিক ও কর্মচারীদের মাঝে বকেয়া আদায়ের দাবি জোরালো হয়েছে।
‘জলিল টেক্সটাইল মিলস ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন’-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মিলটির সাবেক এক হাজার ৭৩ জন শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তার প্রায় ২০.৫৭ কোটি টাকার আইনি পাওনা ও বকেয়া বেতন এখনও বকেয়া রয়েছে। শ্রমিক নেতৃবৃন্দ জমি ও সম্পদ সম্পূর্ণ হস্তান্তরের আগেই তাদের দীর্ঘদিনের বকেয়া পাওনাদি দ্রুত বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে জলিল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড সিবিএ সভাপতি মসিউদ্দৌলা বলেন, আমাদের পাওনা টাকা এখনো বুঝে পাইনি। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার আমরা একাধিক মন্ত্রণালয়ে ও বিটিএমসিতে বৈঠক ও যোগাযোগ করেছি। বিশেষ করে অর্থমন্ত্রী আমাদেরকে আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের পাওনা টাকার কোনো সমাধান না করেই কারখানাটি হস্তান্তর করা হচ্ছে। অতীতে আমরা পাওনা টাকার জন্য কর্মসূচি পালন করেছি। আগামীকালও আমাদের কর্মসূচি থাকবে। আমরা প্রোগ্রাম স্থল থেকে কিছুটা দূরে থাকব। বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করব।
দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার অংশপ্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উদ্যোগটি মূলত বাংলাদেশের সামগ্রিক সামরিক আধুনিকায়ন এবং দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প বা “Made in Bangladesh” স্লোগানকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার মহাপরিকল্পনার অংশ। এর মাধ্যমে সামরিক খাতে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং ভবিষ্যতে দেশের উৎপাদিত সমরাস্ত্র বিদেশে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রাও অর্জন করা সম্ভব হতে পারে।
চাটগাঁ নিউজ/এসএ





