২০২৬ বিশ্বকাপ: গোলের ও মহানায়কের উৎসব, নাকি বিশ্বাসের সংকট?

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন: প্রতিটি ফিফা বিশ্বকাপেরই একটি নিজস্ব পরিচয় থাকে। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ হয়তো শুধু ফুটবলের জন্য নয়, বরং এই ধারণার জন্যও স্মরণীয় হয়ে থাকবে যে অর্থ, রাজনীতি ও প্রভাব খেলার সৌন্দর্যকে ছাপিয়ে গিয়েছিল।

ফুটবল পৃথিবীর সবচেয়ে গণতান্ত্রিক খেলা। একটি প্রত্যন্ত গ্রামের ছেঁড়া বল নিয়ে খেলা কোনো শিশুর স্বপ্ন দেখার অধিকার যেমন আছে, তেমনি বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্টেডিয়ামে খেলা কোনো সুপারস্টারেরও। কিন্তু সেই স্বপ্নের ওপর যেন মূল্য বসিয়ে দিল ফিফা।

ডাইনামিক টিকিট মূল্য, বিলাসবহুল আতিথেয়তা, ব্যয়বহুল স্মারকপণ্য, এমনকি অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন দেখানোর জন্য স্পন্সরকৃত ‘হাইড্রেশন ব্রেক’—সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ যেন ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের উৎসব থেকে ধনীদের বিনোদনে পরিণত হলো। স্পেন-আর্জেন্টিনা ফাইনালের টিকিটের শুরুই ছিল ৪,০০০ ডলারের বেশি, যা ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ ফাইনালের তুলনায় প্রায় সাত গুণ বেশি।

ফিফার কাজ কোনো মহাজন বা নিলামকারীর মতো আচরণ করা নয়। অর্থ স্টেডিয়াম নির্মাণ করতে পারে, কিন্তু কখনোই প্রভাব কিনতে পারে না, কিংবা কোটি কোটি সমর্থকের ভালোবাসা ও আবেগকে নিঃশেষ করতে পারে না। বাণিজ্যিকীকরণ যদি প্রশ্ন তুলেও থাকে, রাজনীতি সেই সন্দেহকে আরও গভীর করেছে।

হোয়াইট হাউসের অনুরোধের পর মার্কিন ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে ফিফা। তিনি একমাত্র খেলোয়াড়, যার লাল কার্ডজনিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। যখন রাজনৈতিক চাপ শাস্তির সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে, তখন ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব আর পুরোপুরি অবাস্তব মনে হয় না। সুইজারল্যান্ডের অধিনায়ক গ্রানিত জাকা বিতর্কিত রেফারিং নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলেন। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার কাছে অতিরিক্ত সময়ে হেরে মিশরের কোচ হোসাম হাসান বলেন, “সবই টাকার খেলা। তারা চায় মেসি টুর্নামেন্টে টিকে থাকুক।”

১৯৮৬ আর ১৯৯০—সেই বিশ্বকাপগুলো আমার কাছে শুধু ফুটবল ছিল না, ছিল এক নির্মল আবেগের নাম। দিয়েগো ম্যারাডোনার জন্য আমি নফল নামাজ পড়েছি, মোমবাতি জ্বালিয়ে তাঁর সাফল্যের জন্য প্রার্থনা করেছি। তিনি আমার ধর্মের মানুষ ছিলেন না, আমার দেশেরও নন—তবুও ফুটবল আমাদের এক করে দিয়েছিল।

আজও সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। তখন ফুটবল মানুষকে বিভক্ত করত না, একত্র করত। আমার প্রার্থনা, ফুটবলের সেই নিষ্পাপ ভালোবাসা, শিহরণ আর উচ্ছ্বাস যেন কখনো অর্থের লোভ, বর্ণবাদের বিষ, রাজনীতির প্রভাব কিংবা ধর্মের বিভাজনের কাছে হার না মানে। কারণ ফুটবলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো—এটি মানুষের হৃদয়কে এক করে, আলাদা করে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলেন, যে সমাজে প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা কমে যায়, সেখানে ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফুটবলও বিশ্বাসের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরলে প্রতিটি বাঁশি, প্রতিটি VAR সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি রেফারিং সিদ্ধান্ত সন্দেহের চোখে দেখা শুরু হয়।
এর মধ্যেও কিছু দল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়েছে। ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাচের পর রাত কাটানোর অনুমতি না দিয়েও তারা দুর্দান্ত লড়াই করে অল্পের জন্য বিদায় নিয়েছে।

সব বিতর্কের মাঝেও ফুটবল আমাদের অসাধারণ কিছু মুহূর্ত উপহার দিয়েছে। ৬০ বছর পর ইংল্যান্ড তাদের সেরা বিশ্বকাপ ফল অর্জন করেছে। জুড বেলিংহ্যাম এক বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের হয়ে সর্বোচ্চ সাত গোল করে ইতিহাস গড়েছেন। আর কিলিয়ান এমবাপ্পে ১০ গোল করে গোল্ডেন বুট জেতার পাশাপাশি বিশ্বকাপে মোট ২২ গোল করে লিওনেল মেসিকেও ছাড়িয়ে গেছেন। এসব অর্জনই হওয়া উচিত ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বিশ্বকাপের গল্প হয়ে উঠেছে রেফারিং বিতর্ক, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন। বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার রেকর্ড আয় বা বিলাসবহুল আতিথেয়তা নয়। এর প্রকৃত শক্তি হলো—বিশ্বের প্রতিটি দেশ, প্রতিটি খেলোয়াড় এবং প্রতিটি সমর্থকের এই বিশ্বাস যে সবাই সমান সুযোগ নিয়ে মাঠে নামে। যাতে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের একটি ছেলে বা মেয়ে বিশ্বাস করতে পারে—বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে পৌঁছানোর টিকিট কেবল তার প্রতিভা, কঠোর পরিশ্রম এবং ন্যায্য খেলাই; অর্থ বা প্রভাব নয়।

ইংল্যান্ডের জন্য এই তৃতীয় স্থানই যেন ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর সবচেয়ে বড় অর্জন। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে হলে এখনও তাদের দরকার আরও কয়েকজন বিশ্বমানের সুপারস্টার, শেষ বাঁশি পর্যন্ত লড়াই করার অসাধারণ স্ট্যামিনা এবং পাহাড়ের মতো অটল কয়েকজন ডিফেন্ডার। তবুও এই বিশ্বকাপ আমাদের অনেক নতুন নায়ক উপহার দিয়েছে। বুকায়ো সাকার হ্যাটট্রিক, জুড বেলিংহ্যামের ইতিহাস গড়া সাত গোল, কিলিয়ান এমবাপ্পের গোল্ডেন বুট, আর হয়তো লিওনেল মেসির আরেকটি গোল্ডেন বল—এসব মুহূর্তই ফুটবলকে অমর করে রাখে।

ম্যারাডোনা, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, মেসি, এমবাপ্পে, বেলিংহ্যাম—প্রজন্ম বদলায়, কিন্তু নায়কেরা থেকে যান। তারাই কোটি কোটি শিশুর স্বপ্নের নাম, তারাই আমাদের চোখে জল এনে দেয়, বুকভরা আনন্দ দেয়, আর মনে করিয়ে দেয়—ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি মানুষের সবচেয়ে সুন্দর আবেগের ভাষা।

লেখক: লন্ডন প্রবাসী শিক্ষাবিদ ও বিশ্লেষক

চাটগাঁ নিউজ/জেএইচ

Scroll to Top