চাটগাঁ নিউজ ডেস্ক : পতেঙ্গা সৈকতে নিখোঁজ স্কুলছাত্র মুফিদ আহমেদ শাওনের (১৪) লাশ উদ্ধারের ঘটনায় তার চার সহপাঠীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পরে তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, এটি নিছক পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা নয়; তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।
তবে পুলিশ বলছে, শাওনের মৃত্যু দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
শাওন হালিশহরের চট্টগ্রাম মডার্ন স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র। পরিবারের সঙ্গে নগরের চুনা ফ্যাক্টরি এলাকায় থাকত সে। তাদের গ্রামের বাড়ি সন্দ্বীপে।
জানা যায়, গত শনিবার শাওনের স্কুলে পরীক্ষা ছিল। দুই ঘণ্টার পরীক্ষায় এক ঘণ্টা পরই খাতা জমা দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে পতেঙ্গা সৈকতে চলে যায়। প্রতিদিন পরীক্ষা শেষে এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে বাসায় ফিরত শাওন। ফুটবল খেলার প্রতিও তার বেশ আগ্রহ ছিল। তবে সেদিন বিকেল গড়িয়ে গেলেও বাসায় ফেরেনি সে। বিকেল তিনটার পর থেকে তার মুঠোফোনেও যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা।
শাওনের বাবা মাহবুবুর রহমান বলেন, একটু দেরি হলেও শাওন ফোন করে জানাত। কিন্তু সেদিন বিকেল তিনটার পর থেকে তার কোনো ফোন পাইনি। তার মা বারবার আমাকে ছেলেকে খুঁজতে বলছিল।
এরপর ছেলের খোঁজে প্রথমে শাওনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইদকানের বাসায় যান তার বাবা। সেখানে কোনো তথ্য না পেয়ে ইদকানের বাবার সহপাঠী ও হালিশহর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জিহাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি।
পরিবার জানায়, শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে কয়েকজন বন্ধুকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তখন তারা শাওন সম্পর্কে পরস্পরবিরোধী তথ্য দিতে থাকে। প্রথমে তারা দাবি করে, সবাই একসঙ্গে পতেঙ্গা থেকে ফিরেছে এবং শাওনকে বি-ব্লক ব্রিজের পাশে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরে সাব্বির নামের আরেক বন্ধুও একই ধরনের তথ্য দেয়। কিন্তু এসব তথ্য যাচাই করেও শাওনের সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরে ওই রাতেই হালিশহর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে তার পরিবার।
পরিবারের দাবি, পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে শাওনের বন্ধুদের বক্তব্যে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসে। প্রত্যক্ষদর্শীদের সামনেও তারা ঘটনার বর্ণনা দেয়।
পুলিশের কাছে দেওয়া বন্ধুদের বক্তব্যের বরাত দিয়ে পরিবার জানায়, শাওনসহ তারা সাগরের পানিতে নেমেছিল। একপর্যায়ে ঢেউয়ের তোড়ে শাওন পানিতে তলিয়ে যেতে শুরু করে। বন্ধুরা তাকে ধরে রাখার চেষ্টা করেও ওপরে তুলতে পারেনি বলে জানায়। একপর্যায়ে তারা শাওনকে ছেড়ে দেয়। পরে সাগরে ভেসে যায় শাওন। এরপর তার স্কুলব্যাগটিও সাগরে ফেলে দিয়ে বন্ধুরা বাড়ি ফিরে যায়।
পরিবারের দাবি, ঘটনার পরপরই বিষয়টি পরিবার বা পুলিশকে না জানিয়ে গোপন রাখে শাওনের বন্ধুরা। আইনি ঝামেলা এড়াতেই তারা বিষয়টি গোপন রেখেছিল বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে।
সোমবার (১৭ আগস্ট) পতেঙ্গা থানা-পুলিশ অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে একটি মরদেহ উদ্ধার করে। পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় মরদেহটি আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফনের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছিল। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মর্গে গিয়ে পরিবারের সদস্যরা মরদেহটি শাওনের বলে শনাক্ত করেন। ওই দিন রাতেই ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ ঘটনায় হালিশহর থানায় শাওনের চার বন্ধুকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে।
শাওনের বাবা মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ওরা যদি সত্যিই শাওনকে বাঁচানোর চেষ্টা করত, তাহলে বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জানাত। হাত ধরে টেনে তুলতে পারেনি, অথচ স্কুলব্যাগ সাগরে ফেলে দিয়েছে। এতে আমাদের সন্দেহ আরও বেড়েছে। আমরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
হালিশহর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী মো. সুলতান আহসান উদ্দিন বলেন, মামলার চার আসামিকেই গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ঘটনাটি দুর্ঘটনা নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে, তা তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
চাটগাঁ নিউজ/এসএ





