ক্রীড়া ডেস্ক: ২৩ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। পর্তুগিজ ফুটবলের এই মহাতারকা বৃহস্পতিবার জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন।
ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জয় এবং পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড নিয়ে বিদায় জানালেন ৪১ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড।
পর্তুগালের হয়ে ২৩৪ ম্যাচ খেলে ১৪৬ গোল করেছেন রোনালদো। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জাতীয় দলের জার্সিতে আলো ছড়ানো এই তারকার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরু হয়েছিল ইউরো ২০০৪-এর আগে। আর শেষটা হলো কোচ হোর্হে জেসুসের সঙ্গে বিরোধের পর জাতীয় দল ছাড়ার মধ্য দিয়ে।
গত মাসে (সেপ্টেম্বরে) নেশন্স লিগের একটি ম্যাচে রোনালদোকে খেলানোর সিদ্ধান্ত নেননি কোচ জেসুস। এ নিয়ে দু’জনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। একপর্যায়ে জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে চলে যান রোনালদো। সেই ঘটনার পরই তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছিল।
আজ বৃহস্পতিবার অবসরের ঘোষণা দিয়ে সেই অধ্যায়ের ইতি টানলেন তিনি। বিদায় বার্তায় তিনি বলেন, ‘সাত নম্বর জার্সি তুলে দেওয়ার সময় এসেছে’।
বিদায়বার্তায় তিনি আরো বলেন, পর্তুগালের হয়ে খেলাকে নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সম্মান হিসেবে উল্লেখ করেন রোনালদো। একই সঙ্গে জাতীয় দলের বিখ্যাত সাত নম্বর জার্সি পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক ভিডিওবার্তায় রোনালদো বলেন, ‘পর্তুগিজদের উদ্দেশে বলছি, জাতীয় দলের সাত নম্বর জার্সিটি আমাদের সবার কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দিন এসেছে। আমি কখনোই মনে করিনি জার্সিটি শুধু আমার। তবে ২৩ বছর ধরে এটি পরার, রক্ষা করার এবং বিশ্বের বিভিন্ন স্টেডিয়ামে নিয়ে যাওয়ার সৌভাগ্য ও দায়িত্ব আমার ছিল। আজ এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার সময় এসেছে।’
সাফল্য-ব্যর্থতার স্মৃতিতে ভরা ক্যারিয়ার
নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের দিকে ফিরে তাকিয়ে রোনালদো জানিয়েছেন, এই পথচলায় যেমন স্মরণীয় জয় ছিল, তেমনি ছিল কঠিন পরাজয় ও হতাশার মুহূর্ত। তবে কোনো পরিস্থিতিতেই পর্তুগালের প্রতিনিধিত্ব করার গর্ব হারাননি তিনি।
রোনালদোর ভাষায়, ‘কিছু বিকেল ও রাত ছিল নিখুঁত। এমন কিছু জয় পেয়েছি, যা কখনো ভুলব না। আবার এমন পরাজয়ও ছিল, যেগুলো আজও মনে করতে কষ্ট হয়। আমিও ব্যর্থ হয়েছি, কষ্ট পেয়েছি। এমন সময়ও এসেছে, যখন পর্তুগিজরা আমার কাছ থেকে যা চেয়েছিল, তা দিতে পারিনি; কিন্তু কখনো হাল ছাড়িনি। আর সবচেয়ে বড় কথা, পর্তুগালের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে গর্বিত হওয়া কখনো বন্ধ করিনি।’
কৃতজ্ঞতা সতীর্থ, কোচ ও পরিবারের প্রতি
দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে পাশে থাকা সতীর্থ, কোচ, চিকিৎসক, ফিজিওথেরাপিস্ট, কর্মকর্তা ও সহায়তাকর্মীদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন রোনালদো। বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন পরিবারের প্রতিও। জাতীয় দলের জন্য সময় দেওয়ার কারণে পরিবারের সদস্যদেরও অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
রোনালদো বলেন, ‘সব কোচ, পরিচালক, চিকিৎসক, ফিজিওথেরাপিস্ট, কর্মী এবং বছরের পর বছর আমার সঙ্গে কাজ করা অসংখ্য মানুষকে ধন্যবাদ। আপনাদের অনেককে ছবিতে দেখা যায়নি, কিন্তু আপনাদের ছাড়া সেই ছবিগুলো কখনো সম্ভব হতো না। আমার পরিবারের প্রতিও কৃতজ্ঞতা, এই স্বপ্ন আমার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্য।’
পরিবারের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, ‘আমার অনুপস্থিতি, ত্যাগ এবং জাতীয় দলকে সময় দেওয়ার কারণে আপনাদেরও অনেক কিছু ছাড় দিতে হয়েছে। জাতীয় দলকে এমন জায়গা দিতে হয়েছে, যে জায়গাটি আপনাদেরও প্রাপ্য ছিল। আমি এত দূর আসতে পেরেছি, কারণ আপনারা সব সময় আমার পাশে ছিলেন।’
‘আমি কখনোই তোমাদের একজন হওয়া বন্ধ করব না’
রোনালদোর বিদায়ে পর্তুগাল ফুটবলের একটি যুগের অবসান ঘটল। এখন জাতীয় দলের ঐতিহ্য ও সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার দায়িত্ব বর্তাবে নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের ওপর। তবে জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ালেও দেশের সঙ্গে তার সম্পর্ক অটুট থাকবে বলে জানিয়েছেন এই তারকা।
বিদায়বার্তায় রোনালদো বলেন, ‘আজ জাতীয় দলের হয়ে আমার পথচলা শেষ করছি। মাথা উঁচু করে বিদায় নিচ্ছি। নিজের পথচলা নিয়ে গর্বিত এবং জানি, পর্তুগালের জন্য আমার সবটুকু দিয়েছি। কিন্তু আমি কখনোই তোমাদের একজন হওয়া বন্ধ করব না।’
নিজের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে পর্তুগালের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাওয়াকেই দেখছেন তিনি। রোনালদোর ভাষায়, ‘আজ বুঝতে পারছি, আমার সবচেয়ে বড় জয় হলো বিশ্বের সেরা দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সৌভাগ্য অর্জন করা। এই ২৩ বছরের জন্য ধন্যবাদ। আমার ওপর বিশ্বাস রাখার জন্য ধন্যবাদ।’
আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নিলেও ক্লাব ফুটবলে খেলা চালিয়ে যাবেন রোনালদো। তার সামনে এখনো ক্যারিয়ারের ১ হাজার গোলের মাইলফলক ছোঁয়ার লক্ষ্য রয়েছে। তবে পর্তুগালের জার্সিতে তার ২৩ বছরের দীর্ঘ পথচলার শেষ হলো এক আবেগঘন বিদায়বার্তার মধ্য দিয়ে।
চাটগাঁ নিউজ/জেএইচ






