সরোজ আহমেদ : ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হয় বিদ্যুতের লুকোচুরি। দিনের ব্যস্ততম সময় পেরিয়ে গভীর রাতেও থামে না সেই দুর্ভোগ। গত দুই সপ্তাহ ধরে এমন বাস্তবতাই নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে চট্টগ্রামবাসীর। দিনে পাঁচ থেকে ছয়বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে কোথাও আধা ঘণ্টা, কোথাও আবার দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সাত থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে।
অসহনীয় গরমের মধ্যে এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ। বাসাবাড়িতে পানির সংকট, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিঘ্ন, ক্ষুদ্র শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কার্যক্রমে ছন্দপতন—সব মিলিয়ে নগর ও জেলার জনজীবন কার্যত অস্বস্তির মধ্যে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও লোডশেডিং নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অসংখ্য মানুষ।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, চলমান সংকটের মূল কারণ গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি। বিশেষ করে মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ফলে দেশের বিভিন্ন গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এর প্রভাব এসে পড়েছে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সরবরাহে, আর সেই ঘাটতির বোঝা বহন করতে হচ্ছে চট্টগ্রামকেও।
মহেশখালীর টার্মিনাল বন্ধ, শুরু সংকট
দেশে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) জাতীয় গ্যাস সঞ্চালন ব্যবস্থায় যুক্ত করার জন্য মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। একটি পরিচালনা করে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি, অন্যটি সামিট এলএনজি টার্মিনাল।
গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর সেটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকেই গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। গ্যাসের এই সংকটের কারণে দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমে এসেছে। যদিও পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছু কেন্দ্র বিকল্পভাবে উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে, তবু জাতীয় পর্যায়ে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।
উৎপাদন হচ্ছে, কিন্তু মিলছে না প্রয়োজনীয় বরাদ্দ
পিডিবি ও পাওয়ার গ্রিড পিএলসি বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম অঞ্চলে বর্তমানে ২৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ৪ হাজার ৮৯৮ মেগাওয়াট।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রাউজান তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকলেও অন্য অধিকাংশ কেন্দ্রে কমবেশি উৎপাদন চলছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ৩ হাজার ৩০২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে। কিন্তু এই বিদ্যুৎ সরাসরি চট্টগ্রামে ব্যবহৃত হয় না। উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রথমে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়। এরপর সারা দেশের চাহিদা বিবেচনায় অঞ্চলভিত্তিক বরাদ্দ দেওয়া হয়। আর সেখানেই তৈরি হচ্ছে সংকট। প্রয়োজনের তুলনায় কম বরাদ্দ পাওয়ায় চট্টগ্রামে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
বুধবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১ হাজার ৪১৫ মেগাওয়াট। সকালে ছিল ১ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট। এর আগের দিন মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চাহিদা ছিল প্রায় ১ হাজার ২৫০ মেগাওয়াট। কিন্তু জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া যায় মাত্র ৯৫০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট ঘাটতি ছিল।
‘যত চাহিদা, তত গ্যাস পাচ্ছি না’
পিডিবি চট্টগ্রাম অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পশ্চিম) একেএম মামুনুল বাশরী বলেন, বর্তমানে লোডশেডিংয়ের অবস্থার উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন হয়নি।
তিনি বলেন, চট্টগ্রামের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদিত সব বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যায়। এরপর সেখান থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়। গ্যাসের সংকটের কারণে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমে গেছে। প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
অনিশ্চয়তায় কবে মিলবে স্বস্তি
পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে চট্টগ্রামে লোডশেডিং পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি তারা।
জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, এলএনজি সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়া, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হওয়া এবং জাতীয় গ্রিডে উৎপাদন বাড়লেই কেবল বর্তমান সংকট কাটতে পারে। তার আগে চট্টগ্রামবাসীকে আরও কিছুদিন লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি সহ্য করতে হতে পারে।
জনমনে প্রশ্ন
নগরবাসীর প্রশ্ন, চট্টগ্রামেই দেশের অন্যতম বৃহৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো থাকলেও কেন প্রয়োজনের সময় এই অঞ্চলই পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ পাচ্ছে না? বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় গ্রিডভিত্তিক সরবরাহ ব্যবস্থায় উৎপাদনকারী অঞ্চল আলাদা কোনো অগ্রাধিকার পায় না। ফলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বেশি হলেও জাতীয় চাহিদা ও বরাদ্দের হিসাবেই বিদ্যুৎ বিতরণ করা হয়।
এদিকে, টানা দুই সপ্তাহের লোডশেডিংয়ে সাধারণ মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে শুরু করেছে। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করে বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
চাটগাঁ নিউজ/এসএ





