আনোয়ারা প্রতিনিধি: সমুদ্র সৈকতের বিস্তীর্ণ বালুচর, পাশে সারি সারি ঝাউবাগান। ঢেউয়ের গর্জন, সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার পারকি সমুদ্র সৈকত। চট্টগ্রাম শহরের নিকটবর্তী হওয়া এবং কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত টানেলকে ঘিরে এ সৈকত দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গুরুত্ব বহন করছে।
তবে অব্যাহত ভাঙন ও সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে বিলীন হচ্ছে ঝাউবাগান। হুমকির মুখে পড়েছে সৈকতের সৌন্দর্য ও স্থায়িত্ব।
উপজেলার উপকূলীয় এলাকায় বঙ্গোপসাগরঘেঁষা প্রায় ১০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে প্রায় ৭ কিলোমিটার এলাকায় ব্লক স্থাপনের মাধ্যমে সুরক্ষাকাজ চলমান থাকলেও রায়পুর ইউনিয়নের উত্তর পরুয়াপাড়া থেকে পারকি সমুদ্র সৈকতসংলগ্ন প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা এখনো অরক্ষিত রয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, চলতি বর্ষা মৌসুমে কোনো প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানলে অরক্ষিত অংশ সাগরে বিলীন হয়ে যেতে পারে।
এ অবস্থায় উপকূল রক্ষা ও পর্যটন খাতের উন্নয়নকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) নতুন একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা যেমন সুরক্ষিত হবে, তেমনি ফিরে আসবে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্র সৈকত পারকির সৌন্দর্যও।
ঝুঁকি মোকাবিলা এবং স্থানীয় কৃষি ও পর্যটন খাতকে চাঙা করতে পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রাম বিভাগ “পারকি সি-বিচ সংরক্ষণ” শীর্ষক ৫৪৮ কোটি ১৯ লাখ ২৬ হাজার টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। প্রকল্পের আওতায় আনোয়ারা পারকি বিচসংলগ্ন ২ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকা সংরক্ষণ করা হবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সুরক্ষা পাবে কর্ণফুলী টানেলের সংযোগ সড়ক, নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, কর্ণফুলী টানেল সার্ভিস এরিয়া এবং পারকি সমুদ্র সৈকতের পর্যটন এলাকা।
জানা গেছে, ২০২০ সালের আম্ফান, ২০২১ সালের ইয়াস, ২০২২ সালের সিত্রাং, ২০২৩ সালের মোখা ও হামুন এবং ২০২৪ সালের রেমাল ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে গত কয়েক বছরে আনোয়ারা উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে বেড়িবাঁধ, বসতবাড়ি, কৃষিজমি, মৎস্য খাত, সড়ক-বাজার ও পারকি সমুদ্র সৈকত এলাকায় ভয়াবহ ভাঙনের সৃষ্টি হয়। ফলে নষ্ট হচ্ছে সৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং ঝুঁকির মুখে পড়ছে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, এর আওতায় ৩০ দশমিক ৩৮ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণ, ৩ দশমিক ৪৬০ কিলোমিটার উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ, ২ দশমিক ৭৩০ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ, পানি নিষ্কাশনের জন্য দুই ভেন্টবিশিষ্ট একটি রেগুলেটর স্থাপন, ২ দশমিক ৭৩০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ এবং ১ দশমিক ৬০০ কিলোমিটার খাল খনন করা হবে। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। এর মেয়াদকাল ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত।
প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় বন্যা ব্যবস্থাপনা জোরদার, লবণাক্ত পানির প্রবেশ রোধ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, স্থানীয় সাপমারা খালে মাছ ধরার ট্রলারের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিতকরণ, উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী সম্প্রসারণ এবং পর্যটন সুবিধা সৃষ্টি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রাম বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী-১ শওকত ইবনে সাহীদ বলেন, আনোয়ারা উপকূলের প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এ অঞ্চলের পাশে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থাপনাও আছে। সেগুলো রক্ষার জন্য একটি প্রকল্প প্রস্তাব বোর্ডে জমা দেওয়া হয়েছে। বোর্ড থেকে কিছু সংশোধনী দেওয়া হয়েছে। সংশোধন শেষে আবার পাঠানো হবে। অনুমোদন পেলে বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকা সুরক্ষিত হবে।
চাটগাঁ নিউজ/সাজ্জাদ/এমকেএন





