নাম ফিরে পেল আগাছার জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া ‘মিনি বাংলাদেশ’

নিজস্ব প্রতিবেদক : চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁওয়ের বহদ্দারহাটে ১৬ একরের বেশি জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা ‘মিনি বাংলাদেশ’ এখন যেন এক পরিত্যক্ত জনপদ। একসময় যেখানে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্থাপত্যের প্রতিরূপ দেখতে প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থীর ভিড় লেগে থাকত, সেখানে এখন সুনসান নীরবতা। চারদিকে আগাছা, ঝোপঝাড় আর ভাঙাচোরা স্থাপনা। দীর্ঘদিনের অযত্নে দেশের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর ক্ষুদ্র প্রতিরূপগুলোও হারাচ্ছে তাদের স্বাভাবিক সৌন্দর্য।

আহসান মঞ্জিলের আদলে নির্মিত গোলাপি রঙের ভবনটির দিকে তাকালে এখন আর বোঝার উপায় নেই এটি দেশের অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপনার আদলে নির্মিত। দেয়ালে ফাটল, খসে পড়েছে পলেস্তারা। চারপাশ ঢেকে গেছে ঘন জঙ্গলে। আগাছায় এমনভাবে ঢেকে গেছে সিঁড়ি যে ভবনটির ভেতরে প্রবেশ করাই কঠিন। ভেতরেও জন্মেছে গাছপালা।

শুধু আহসান মঞ্জিল নয়, জাতীয় সংসদ ভবন, লালবাগ কেল্লা, কার্জন হল, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, ছোট সোনা মসজিদ, কান্তজিউ মন্দির, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, শহীদ মিনার ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ভবনের প্রতিরূপেরও একই দশা। কোথাও ফাটল, কোথাও খসে পড়েছে পলেস্তারা; কোনোটি আবার আগাছার আড়ালে প্রায় অদৃশ্য।

১৬ একরে ‘মিনি বাংলাদেশ’
বাংলাদেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও স্থাপত্য নিদর্শন সম্পর্কে মানুষকে ধারণা দিতে ১৬ দশমিক ৩৭ একর জায়গাজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছিল এ কমপ্লেক্স। প্রায় ৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে কমপ্লেক্সটি নির্মাণ করে কনকর্ড। ২০০৬ সালের ২৯ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এর উদ্বোধন করেন।

২০০৬ সালে এটি ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’ নামে প্রতিষ্ঠিত হলেও পরে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘স্বাধীনতা কমপ্লেক্স’। দেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনার ক্ষুদ্র প্রতিরূপ থাকায় একসময় এটি ‘মিনি বাংলাদেশ’ নামে ব্যাপক পরিচিতি পায়।

জাতীয় সংসদ ভবন, আহসান মঞ্জিল, কার্জন হল, লালবাগ কেল্লা, কান্তজিউ মন্দির, বড় কুঠি, ছোট সোনা মসজিদ ও পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারসহ দেশের উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য নিদর্শনের প্রতিরূপ ছিল এখানে। এক জায়গায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ইতিহাস ও স্থাপত্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এমন সুযোগ চট্টগ্রামে খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।

তালাবদ্ধ প্রবেশপথ
সম্প্রতি কমপ্লেক্সের মূল ফটকে গিয়ে দেখা যায়, প্রবেশপথে ঝুলছে তালা। জেলা প্রশাসনের মৌখিক অনুমতি নিয়ে দায়িত্বে থাকা একজন নিরাপত্তাকর্মী ফটক খুলে দেন। ভেতরে ঢুকতেই বাঁ পাশে দেখা যায় টিকিট কাউন্টার ও স্মারক সামগ্রীর দুটি দোকান। একটি এখন নিরাপত্তাকর্মীদের অস্থায়ী থাকার জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্যটি পড়ে আছে ভাঙাচোরা অবস্থায়। চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ইট-পাথর।

কয়েক কদম এগোতেই চোখে পড়ে জাতীয় সংসদ ভবনের প্রতিরূপ। দেয়ালে শেওলা জমেছে, বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে ফাটল। দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাব স্পষ্ট। এরপর চোখে পড়ে স্বাধীনতা টাওয়ার। প্রায় ২৪ তলা ভবনের সমান উচ্চতার এ টাওয়ারের চূড়ায় ছিল ঘূর্ণমান রেস্তোরাঁ। এখন লিফট অচল। চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে ভাঙা কাচ।

টাওয়ারের বিপরীতে শিশুদের খেলার জায়গাটিও এখন পরিত্যক্ত। পাশেই সেন্ট নিকোলাস চার্চ। কিন্তু আগাছায় ঢাকা পড়েছে সেখানে যাওয়ার পথ। কোথাও কোথাও কোমরসমান ঘাস ও ঝোপঝাড়ে পথ চেনাই কঠিন।

মরিচা ধরেছে বিনোদন রাইডে
একসময় দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বিনোদন রাইডগুলো। এখন সেগুলোর অধিকাংশই পড়ে আছে ব্যবহারের অনুপযোগী অবস্থায়। রোলার কোস্টার, ফেরিস হুইল, মেরি-গো-রাউন্ড ও শিশুদের বিভিন্ন রাইডে মরিচা ধরেছে। অনেক জায়গা থেকে যন্ত্রাংশ খুলে নেওয়া হয়েছে। বাম্পার কার এলাকার লোহার ছাউনিও ভেঙে নিচে পড়ে আছে। গাড়িগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।

ঘাস ঠেলে সামনে এগোলে দেখা যায় বড় কুঠি। একসময় এখানে ছিল ছোট ট্রেনের স্টেশন। এই স্টেশন থেকেই দর্শনার্থীরা ট্রেনে চড়ে পুরো পার্ক ঘুরে দেখতেন। এখন ভবনের দেয়ালে ফাটল, শেওলা ও আগাছা। চারপাশে পোকামাকড়ের বিচরণ। পুরো রেলপথের বড় একটি অংশে এখন লোহার রেললাইন নেই। পড়ে আছে শুধু পাথর।

হারিয়ে গেছে পথ
ট্রেন চলাচলের জন্য তৈরি কৃত্রিম সুড়ঙ্গটির দিকেও এখন যাওয়া কঠিন। সুড়ঙ্গের মুখে পানি জমে আছে। চারপাশে কচুগাছ, আগাছা ও ঝোপঝাড়। পাশের পাহাড়ে ওঠার সিঁড়িও ব্যবহার অনুপযোগী। মাঝপথে ভেঙে পড়া একটি বড় গাছ পুরো পথ আটকে দিয়েছে। পাহাড়ি পরিবেশ তৈরির জন্য নির্মিত কৃত্রিম পাথরের কাঠামোগুলোও বিভিন্ন জায়গায় ভেঙে পড়েছে। মূল অংশে ফিরে ডান দিকে এগোলে দেখা যায় জাতীয় স্মৃতিসৌধের প্রতিরূপ। সেটিও আগাছায় ঢাকা। একই অবস্থা বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ভবনের প্রতিরূপে।

লালবাগ কেল্লার বিভিন্ন অংশে দেখা গেছে ফাটল। পাশের কৃত্রিম জলাধারে নেই পানি। কার্জন হলের সামনের অংশও চলে গেছে জঙ্গলের আড়ালে। কান্তজিউ মন্দিরের প্রতিরূপেও একই চিত্র।

আহসান মঞ্জিলের সামনে গিয়ে দেখা যায়, সিঁড়ি থেকে ভবনের ভেতর পর্যন্ত জন্মেছে গাছপালা। ছোট সোনা মসজিদের প্রতিরূপে বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরেছে, খসে পড়েছে পলেস্তারা। পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের প্রতিরূপও ঘন জঙ্গলের আড়ালে প্রায় অদৃশ্য। শহীদ মিনারের গায়েও দেখা গেছে ফাটল।

জলাবদ্ধতা, শেওলা আর চুরির শঙ্কা
সংসদ ভবনের পাশের কৃত্রিম লেকের পানি ঘোলাটে হয়ে গেছে। পানির ওপর জমেছে শেওলার স্তর। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ায় বিভিন্ন জায়গায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।

নিরাপত্তাকর্মীরা জানান, সম্প্রতি ভারী বর্ষণের সময় পুরো পার্কে গোড়ালি থেকে হাঁটুপানি জমেছিল।

পার্কের বিভিন্ন স্থানে গ্রিল কেটে ভেতরে প্রবেশের চিহ্নও রয়েছে। বর্তমানে নয়জন নিরাপত্তাকর্মী তিন শিফটে দায়িত্ব পালন করছেন।

নিরাপত্তাকর্মী মোহাম্মদ বশর বলেন, সুযোগ পেলেই দুর্বৃত্তরা পার্কের ভেতরে ঢুকে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও লোহার সামগ্রী নিয়ে যায়। বাধা দিতে গেলে কখনো ধারালো অস্ত্র নিয়ে তেড়ে আসে, আবার কখনো পাথর ছোড়ে। দীর্ঘদিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা না হওয়ায় মশা ও পোকামাকড়ের উপদ্রবও বেড়েছে।

৫ আগস্টের পর বন্ধ
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত পার্কটি ইজারার মাধ্যমে পরিচালনা করছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের একজন সংসদ সদস্যের ভাইয়ের একটি প্রতিষ্ঠান। ওই দিন সরকার পতনের পর রাতে শত শত বিক্ষুব্ধ মানুষ পার্কে প্রবেশ করে বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর চালায়। এরপর আর পার্কটি দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়নি।

দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও বন্ধ হয়ে যায়। এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা আরও জরাজীর্ণ হয়েছে এবং আগাছায় ঢেকে গেছে পুরো কমপ্লেক্স।

চুক্তি অনুযায়ী নির্মাণের পর ২০১০ সাল পর্যন্ত পার্কটি পরিচালনা করে কনকর্ড। পরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ইজারা নিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। ২০১৫ সালের এপ্রিলে মেয়াদ শেষ হলে চসিক নতুন করে ইজারা নিতে আগ্রহ দেখায়নি। একই বছরের নভেম্বরে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কমপ্লেক্সটি ইজারা নেয়। তখন প্রবেশমূল্য নির্ধারণ করা হয় ১৫০ টাকা।

সর্বশেষ ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের একজন পরিচালক ছিলেন নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি হেলাল উদ্দিন, যিনি সাবেক সংসদ সদস্য মো. মহিউদ্দিন বাচ্চুর ভাই। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৯ ডিসেম্বর ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ইজারা চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে।

সংস্কারের অপেক্ষায় জেলা প্রশাসন
স্বাধীনতা কমপ্লেক্সের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, পার্কটি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী পরিদর্শন করেছেন। তবে সংস্কার বা পুনরায় চালুর বিষয়ে এখনো কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে জেলা প্রশাসন।

এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে ‘মিনি বাংলাদেশ’ পরিচালনার দায়িত্ব পেতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি দিয়েছিল চসিক। পার্কটি আবার সিটি করপোরেশনের কাছে বরাদ্দ দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।

চট্টগ্রাম সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, পার্কটি পুনরায় বরাদ্দ পাওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছিল। বরাদ্দ পেলে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে এটিকে নগরবাসীর জন্য একটি সুস্থ বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।

ফিরল পুরোনো নাম
এর মধ্যে কমপ্লেক্সটির নাম নিয়েও এসেছে নতুন সিদ্ধান্ত। ২০০৬ সালে ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’ নামে প্রতিষ্ঠিত হলেও পরবর্তী সময়ে এর নাম পরিবর্তন করে ‘স্বাধীনতা কমপ্লেক্স’ করা হয়েছিল।

গত ৬ জুন চট্টগ্রামে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো পরিদর্শনের সময় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমদ আযম খান বলেন, আগের সময়ে ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’-এর নাম পরিবর্তন করা হয়েছিল এবং এটি প্রতিহিংসামূলক রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ। তিনি জানান, মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে কমপ্লেক্সটির নাম আবার ‘শহীদ জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’ করা হবে।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ১২ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন শাখার এক প্রজ্ঞাপনে কমপ্লেক্সটির নাম পুনর্নির্ধারণ করা হয় ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’।

প্রজ্ঞাপনে চট্টগ্রামের চান্দগাঁও মৌজায় ১৬ দশমিক ৩৭ একর জমির ওপর অবস্থিত স্থাপনাটিকে এখন থেকে ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’ নামে অভিহিত করার কথা জানানো হয়েছে।ইতিহাসের প্রতিরূপ বাঁচাতে এখনই উদ্যোগ দরকার বলে মনে করছেন অনেকে।

চট্টগ্রামের নগরবাসীর কাছে প্রশ্ন এখন একটাই—নাম ফিরে পাওয়ার পর ‘মিনি বাংলাদেশ’ কি আবারও তার পুরোনো প্রাণ ফিরে পাবে, নাকি ইতিহাসের প্রতিরূপগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে আগাছা আর অবহেলার আড়ালে?

চাটগাঁ নিউজ/এসএ

Scroll to Top