জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়: ঘণ্টায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে ৫,৩৭০ মেগাওয়াট
কারণ খুঁজতে তদন্ত কমিটি

চাটগাঁ নিউজ ডেস্ক: জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে বিপর্যয়ের কারণে এক ঘণ্টার ব্যবধানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে প্রায় ৫ হাজার ৩৭০ মেগাওয়াট। মঙ্গলবার দুপুরে আকস্মিক এ ঘটনায় রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। বন্ধ হয়ে যাওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পুনরায় চালুর মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) আশা করছে রাত সাড়ে ১০টার মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

এদিকে আকস্মিক এই বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পেছনে কী কারণ ছিল, তা খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি)। আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে কমিটিকে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের সুপারিশও করবে কমিটি।

আজ মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাতে পিজিসিবি এ তথ্য জানিয়েছে। যেখানে কমিটির প্রধান করা হয়েছে প্রধান প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সঞ্চালন-২ এর সৈয়দ এবাদুল্লাহ হায়দার আলীকে।

প্রতিষ্ঠানটি জানায়, কমিটিকে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে করণীয় নির্ধারণ করে মতামত ও সুপারিশ দিতে বলা হয়েছে।

পাওয়ার গ্রিড সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ১৪ হাজার ৭১৯ মেগাওয়াট। বড় কয়েকটি কয়লাভিত্তিক ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুপুর ১টায় উৎপাদন নেমে আসে ৯ হাজার ৩৪৯ মেগাওয়াটে। এতে মাত্র এক ঘণ্টায় উৎপাদন কমে ৫ হাজার ৩৭০ মেগাওয়াট।

বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানান, বন্ধ হয়ে যাওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো আবার চালুর কাজ চলছে। কয়েকটি ইউনিট ইতিমধ্যে উৎপাদনে ফিরেছে, অন্যগুলোও ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়াচ্ছে। আজ রাত সাড়ে ১০টার মধ্যে পরিস্থিতি সহনীয় পর্যায়ে পৌঁছাবে।

তিনি আরো জানান, গ্রিড বিপর্যয়ের সুনির্দিষ্ট কারিগরি কারণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। রাষ্ট্রায়ত্ত সঞ্চালন সংস্থা পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি তদন্ত করে এ বিষয়ে জানাবে। গ্রিড পরিচালনাকারীরা সঞ্চালন ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে ব্যস্ত থাকায় দুপুর ৩টার পর উৎপাদনের ঘণ্টাভিত্তিক তথ্য হালনাগাদ করা সম্ভব হয়নি। তবে ওই সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ১০ হাজার ৮২৫ মেগাওয়াট।

জানা গেছে, গ্রিড বিপর্যয়ে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে। দুপুর ১২টায় এসব কেন্দ্র থেকে ৪ হাজার ৩৮২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছিল। এক ঘণ্টা পর তা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৩৪ মেগাওয়াটে। অর্থাৎ, উৎপাদন কমেছে ২ হাজার ৬৪৮ মেগাওয়াট বা প্রায় ৬০ দশমিক ৪ শতাংশ।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। দুপুর ১২টায় এসব কেন্দ্র থেকে ৪ হাজার ৮৬৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া গেলেও দুপুর ১টায় তা নেমে আসে ২ হাজার ৯৪৭ মেগাওয়াটে। এতে উৎপাদন কমেছে ১ হাজার ৯১৬ মেগাওয়াট বা প্রায় ৩৯ দশমিক ৪ শতাংশ।

শুধু গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রেই উৎপাদন কমেছে মোট ৪ হাজার ৫৬৪ মেগাওয়াট। বাকি ৮০৬ মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হয়েছে অন্যান্য উৎস থেকে উৎপাদন কমে যাওয়ায়।

বিপিডিবি কর্মকর্তা জহুরুল ইসলাম জানান, উৎপাদন পরিস্থিতি পুনরুদ্ধারে বিবিয়ানা-৩ ও আরএনপিএল ইউনিট-১-সহ বিভিন্ন ইউনিট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রায় ৩৫৩ থেকে ৩৫৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি ইউনিট পূর্ণ উৎপাদনে ফেরার পথে রয়েছে। এ ছাড়া ৪১২ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট চালুর প্রস্তুতি চলছে।

তাঁর ভাষ্য, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যায়ক্রমে উৎপাদনে ফিরলে পরবর্তী চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হতে পারে। তবে ঠিক কতটি কেন্দ্র বন্ধ হয়েছিল এবং রাত ১০টার মধ্যে কোন কোন কেন্দ্র পুরোপুরি চালু হবে, সে বিষয়ে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ণাঙ্গ তালিকা দিতে পারেননি। সঞ্চালন ব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখতে জাতীয় গ্রিড পরিচালনাকারীদের সঙ্গে সমন্বয় করে ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য অনুযায়ী, বিপর্যয়ের প্রভাবে রাজধানীর পূর্বাঞ্চলের ভুলতা, হরিপুর, সিদ্ধিরগঞ্জ, গুলশান, রামপুরা, উলন ও মতিঝিল এলাকার আওতাধীন স্থানগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকাতেও সরবরাহে সমস্যা দেখা দিয়েছে।

বর্তমানে জাতীয় লোড ডেসপ্যাচ সেন্টারের (এনএলডিসি) সরাসরি নিয়ন্ত্রণে প্রকৌশলীরা ধাপে ধাপে সঞ্চালন লাইন চালুর কাজ করছেন।

উল্লেখ্য, আজ মঙ্গলবার দুপুর আনুমানিক ১২টা ৪৩ মিনিটে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে এই বিপর্যয় ঘটে। যার ফলে চট্টগ্রাম-ঢাকা-সিলেটের অধিকাংশ এলাকায় লোডশেডিংয়ের তীব্রতা বেড়ে যায়।

চাটগাঁ নিউজ/জেএইচ

Scroll to Top