ছেলের ফল বদলে ‘এ প্লাস’— সচিবসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট

নিজস্ব প্রতিবেদক : চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সাবেক সচিব নারায়ণ চন্দ্রনাথসহ চারজনের বিরুদ্ধে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল জালিয়াতির মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে নারায়ণ চন্দ্রনাথ তাঁর ছেলে নক্ষত্র দেবনাথের ফলাফল পরিবর্তন করেন। এ কাজে তাঁকে সহায়তা করেন বোর্ডের সাবেক সিস্টেম অ্যানালিস্ট কিবরিয়া মাসুদ খান।

গত ১৮ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এস এম সফিউল আজম মুন্সী আদালতে এ অভিযোগপত্র জমা দেন। এতে নারায়ণ চন্দ্রনাথ, কিবরিয়া মাসুদ খান, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মুস্তফা কামরুল আখতার এবং নারায়ণের ছেলে নক্ষত্র দেবনাথকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় ১১ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।

তদন্তকারী কর্মকর্তা এস এম সফিউল আজম মুন্সী বলেন, চারজনকে আসামি ও ১১ জনকে সাক্ষী করে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। ধার্য তারিখে আদালত অভিযোগপত্র পরীক্ষা করে পরবর্তী আদেশ দেবেন। আসামিদের বিরুদ্ধে পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইনের পাশাপাশি দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

১৪ উত্তরপত্রে নম্বর বাড়ানোর অভিযোগ

অভিযোগপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন নারায়ণ চন্দ্রনাথের ছেলে নক্ষত্র দেবনাথ। ফল প্রকাশের আগে তাঁর প্রাপ্ত নম্বর পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তিনি কোনোমতে উত্তীর্ণ হওয়ার অবস্থায় ছিলেন। এরপর তাঁর ফলাফল পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

জব্দ করা উত্তরপত্র, নম্বর ফর্দ এবং অন্যান্য নথি পর্যালোচনা করে তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন, রচনামূলক ও নৈর্ব্যক্তিক মিলিয়ে নক্ষত্রের ১৪টি উত্তরপত্রে ২ থেকে সর্বোচ্চ ২৪ নম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এর ফলে তাঁর ফলাফল ‘এ প্লাস’-এ উন্নীত হয়।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বাংলা প্রথম পত্রের রচনামূলকে নক্ষত্র পেয়েছিলেন ৩১ নম্বর। সেটি বাড়িয়ে করা হয় ৪১। নৈর্ব্যক্তিকে পাওয়া ২৪ নম্বরের সঙ্গে যোগ করা হয় আরও ২ নম্বর।

ইংরেজি প্রথম পত্রের রচনামূলকে পাওয়া ৭০ নম্বর বাড়িয়ে করা হয় ৯০। দ্বিতীয় পত্রে পাওয়া ৫৭ নম্বরের সঙ্গে ২৪ নম্বর যোগ করে দেওয়া হয় ৮১।

পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের রচনামূলকে পাওয়া ৩৪ নম্বরের সঙ্গে আরও ৮ নম্বর যোগ করা হয়। দ্বিতীয় পত্রের নৈর্ব্যক্তিকে পাওয়া ২০ নম্বর বাড়িয়ে করা হয় ২২।

রসায়ন প্রথম পত্রের রচনামূলকে পাওয়া ৩০ নম্বর বাড়িয়ে করা হয় ৪০। একই পত্রের নৈর্ব্যক্তিকে ৩ নম্বর বাড়িয়ে ২৩ করা হয়। দ্বিতীয় পত্রের নৈর্ব্যক্তিকেও ১৯ নম্বরের সঙ্গে আরও ৪ নম্বর যোগ করে ২৩ দেখানো হয়। জীববিজ্ঞান প্রথম পত্রের রচনামূলকে পাওয়া নম্বরও ১০ বাড়িয়ে ৩৯ করা হয়।

অবসরকালীন ছুটিতেও ‘ফল প্রস্তুতের’ দায়িত্ব

তদন্তে কিবরিয়া মাসুদ খানের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে অভিযোগপত্রে। এতে বলা হয়, জালিয়াতিতে সহযোগিতার বিনিময়ে অবসরকালীন ছুটিতে থাকা কিবরিয়া মাসুদ খানকে ২০২৪ সালের ফলাফল প্রস্তুতের কাজে যুক্ত করা হয়। এ কাজের জন্য তাঁকে দৈনিক ২ হাজার টাকা ভাতা দেওয়ার তথ্যও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, নারায়ণ চন্দ্রনাথ ক্ষমতার অপব্যবহার করে কিবরিয়া মাসুদ খানের সহায়তায় ছেলের ফলাফল পরিবর্তনে জড়িত ছিলেন—জব্দ করা উত্তরপত্র ও নম্বর ফর্দসহ তদন্তে পাওয়া তথ্য-উপাত্তে এর প্রমাণ মিলেছে।

ফল প্রকাশের পরই অভিযোগ প্রকাশ্যে

২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয় ওই বছরের ২৬ নভেম্বর। ফল প্রকাশের পর নারায়ণ চন্দ্রনাথের ছেলের ফলাফল নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে। পরে কে বা কারা নক্ষত্র দেবনাথের ফলাফল পুনর্নিরীক্ষণের জন্য শিক্ষা বোর্ডে আবেদন করেন।

তবে পুনর্নিরীক্ষণের আবেদনের বিরুদ্ধে পাঁচলাইশ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন নক্ষত্রের মা বনশ্রী দেবনাথ। এ ঘটনায় ফলাফল জালিয়াতির অভিযোগ নিয়ে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।

এরপর বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। ২০২৪ সালের জুনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ওই বছরের ৯ জুলাই নারায়ণ চন্দ্রনাথকে শিক্ষা বোর্ড থেকে সরিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) বিভাগের চট্টগ্রামের পরিচালক পদে দেওয়া হয়। পরে ২৩ সেপ্টেম্বর তাঁকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। তদন্তের পর নক্ষত্র দেবনাথের ওই ফলাফল বাতিল করা হয়।

মামলা, কারাগার ও এখন জামিনে

২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের তৎকালীন সচিব অধ্যাপক ড. এ কে এম সামছু উদ্দিন আজাদ পাঁচলাইশ থানায় চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

মামলার পর গত ১৭ জুন আদালতে আত্মসমর্পণ করলে নারায়ণ চন্দ্রনাথকে কারাগারে পাঠানো হয়। বর্তমানে তিনি জামিনে রয়েছেন।

নারায়ণ চন্দ্রনাথ ২০১৯ সাল থেকে প্রায় পাঁচ বছর চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে পর্যায়ক্রমে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, সচিব ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর ছেলে নক্ষত্র দেবনাথ চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন।

ফলাফল জালিয়াতির এই অভিযোগপত্রের মাধ্যমে এখন মামলাটি নতুন পর্যায়ে গেল। অভিযোগপত্র গ্রহণ, আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন এবং পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হবে—ছেলের ফল পরিবর্তনে আসলে কার কী ভূমিকা ছিল এবং অভিযোগগুলোর কতটা আদালতে প্রমাণিত হয়।

চাটগাঁ নিউজ/এসএ

Scroll to Top