নিজস্ব প্রতিবিদেক: ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলীখেলার ১১৭তম আসরেও চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন কুমিল্লার বাঘা শরীফ। যেখানে উত্তেজনাপূর্ণ লড়াইয়ে রাশেদ বলীকে হারিয়ে আবারও চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন বাঘা। এ নিয়ে টানা চতুর্থবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন তিনি।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) দুপুর ৩টার দিকে খেলার উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী।
এসময় ফাইনালে দুই বলীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে খেলেন দুই জন। ২৪ মিনিট ২৬ সেকেন্ডের খেলায় রাশেদকে পরাজিত করে জয়ী হন বাঘা শরীফ।

এর আগে প্রথম সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয় মিঠু ও রাশেদ। এ খেলায় মিঠুকে হারিয়ে রাশেদ ফাইনালে যান। দ্বিতীয় সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয় বাঘা শরীফ ও শাহ জালাল। যদিও সমঝোতার ভিত্তিতে বাঘা শরীফকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। ফলে ফাইনালে মুখোমুখী হন গতবারের দুই ফাইনালিস্ট বাঘা শরীফ ও রাশেদ। এ নিয়ে টানা তিন আসরে ফাইনালে মুখোমুখী হয়েছেন তারা। এদিকে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে জিতেছেন মিঠু।
এবারের আসরে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মোট ১০৮ জন বলী অংশগ্রহণ করেন। কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নোয়াখালী, ফেনী, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ছাড়াও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা বলীদের উপস্থিতি প্রতিযোগিতাকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তোলে। বিশেষ করে এবারের আসরে তরুণ বলীদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো, যা ভবিষ্যতে এই ঐতিহ্যবাহী খেলাটির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
খেলার শুরু থেকেই প্রতিটি রাউন্ডে ছিল উত্তেজনাপূর্ণ লড়াই। প্রথম রাউন্ড থেকেই জয়ী বলীদের পুরস্কারের ব্যবস্থা রাখা হয়। প্রাথমিক ধাপে জয়ী ৫০ জন বলীকে সনদসহ পুরস্কার প্রদান করা হয়। এরপর ধাপে ধাপে সেরা বলীদের মধ্য থেকে চূড়ান্তভাবে শীর্ষ চারজনকে নির্বাচন করা হয়, যারা সেমিফাইনাল ও ফাইনালে লড়াই করেন।
ফাইনালে উঠে কুমিল্লার রাশেদ বলী ও সাবেক দুইবারের চয়াম্পিয়ন বাঘা শরীফ। এ দুই বলীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষে কুমিল্লার বাঘা শরীফ বলী বিজয়ী হন এইবার সহ তিনবার।
খেলা শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি) আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান। অনুষ্ঠানে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন চসিক সচিব আশরাফুল আমিন।

মাঠজুড়ে দিনভর দর্শকের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। লালদীঘি মাঠের চারপাশ, আশপাশের ভবনের ছাদ এমনকি দেয়াল টপকে মানুষ খেলা উপভোগ করেন। তীব্র রোদ উপেক্ষা করে দর্শকদের এই উপস্থিতি প্রমাণ করে, এক শতাব্দীর বেশি সময় পেরিয়েও জব্বারের বলীখেলার জনপ্রিয়তা একটুও কমেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি চট্টগ্রামের মানুষের আবেগ ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশে পরিণত হয়েছে।
এবারের আয়োজনকে ঘিরে ২৪ ও ২৫ এপ্রিল দুই দিনব্যাপী বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়। মেলায় বসে দেশীয় পণ্য, মাটির জিনিসপত্র, বাঁশ ও কাঠের তৈরি হস্তশিল্প, খেলনা এবং নানা ধরনের খাবারের স্টল। শিশু-কিশোরদের জন্য নাগরদোলা ও বিভিন্ন বিনোদনের ব্যবস্থাও ছিল। ফলে বলীখেলাকে কেন্দ্র করে পুরো লালদীঘি এলাকা উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।
আয়োজকরা জানান, এসএসসি পরীক্ষার বিষয়টি মাথায় রেখে এবারের মেলার সময়সূচিতে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। পরীক্ষার্থীদের কোনো ধরনের সমস্যা না হয়, সে জন্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কার্যক্রম শেষ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নেওয়া হয় ব্যাপক প্রস্তুতি। মাঠজুড়ে সিসিটিভি ক্যামেরা, ওয়াচ টাওয়ার, ড্রোন পর্যবেক্ষণসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ, র্যাব ও অন্যান্য সংস্থার সমন্বয়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসা সেবার জন্য মেডিকেল টিম ও ফায়ার সার্ভিস প্রস্তুত রাখা হয়।
ঐতিহাসিক এই বলীখেলার সূচনা হয়েছিল ১৯০৯ সালে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর তরুণদের শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং তাদের সংগঠিত করার উদ্দেশে এই প্রতিযোগিতার প্রচলন করেন। সেই ধারাবাহিকতায় শতাধিক বছর ধরে এটি চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান লোকজ ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।
প্রতি বছর বাংলা পঞ্জিকার ১২ বৈশাখে অনুষ্ঠিত হওয়া এই বলীখেলা এখন আর শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি চট্টগ্রামের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং মানুষের মিলনমেলার প্রতীক। এবারের ১১৭তম আসরও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে মাঠজুড়ে ছিল প্রতিযোগিতার উত্তেজনা, দর্শকদের উচ্ছ্বাস এবং ঐতিহ্যের অনন্য মেলবন্ধন।
চাটগাঁ নিউজ/জেএইচ





