চাটগাঁ নিউজ ডেস্ক : চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এক শিক্ষার্থীর উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের সময় খাতায় পাওয়া নম্বরের সঙ্গে প্রকাশিত ফলাফলের বড় ধরনের অমিল ধরা পড়ার পর সামনে এসেছে ফলাফল কারসাজির অভিযোগ।
একটি বিষয়ে খাতায় শূন্য থাকলেও প্রকাশিত ফলাফলে ওই বিষয়ে ৪৫ নম্বর দেখানো হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু একটি বিষয় নয়, পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আবেদন করা তিনটি বিষয়ের খাতাতেই নম্বরের অমিল পাওয়া যায়।
পরে ওই শিক্ষার্থীর অন্যান্য বিষয়ের উত্তরপত্রও যাচাই করা হলে সেখানেও খাতায় পাওয়া নম্বরের সঙ্গে প্রকাশিত ফলাফলের পার্থক্য শনাক্ত হয়। এ ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড। তদন্ত কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। নির্ধারিত সময় শেষ হলেও তদন্তের কাজ এখনো শেষ হয়নি।
গত ২৫ আগস্ট পুনঃনিরীক্ষণ কার্যক্রমের সময় এ ঘটনা ধরা পড়ে। একজন পরীক্ষক পদার্থবিজ্ঞানের একটি উত্তরপত্র পরীক্ষা করতে গিয়ে খাতায় থাকা নম্বরের সঙ্গে প্রকাশিত ফলাফলের অমিল দেখতে পান। খাতায় যেখানে শূন্য নম্বর ছিল, প্রকাশিত ফলাফলে সেখানে ৪৫ নম্বর দেখানো হয়।
পরে বিষয়টি উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (মাধ্যমিক) মোহাম্মদ আবদুল মন্নানকে জানানো হলে তিনি কম্পিউটার সেন্টারের ডাটার সঙ্গে উত্তরপত্রের নম্বর মিলিয়ে দেখেন। তখনও অমিল ধরা পড়ে। এরপর পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বিষয়টি লিখিতভাবে বোর্ড চেয়ারম্যানকে জানান।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় সেদিনই চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপনকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
তিনি বলেন, এ রকম একটা অভিযোগ উঠার পর আমাকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে। তদন্ত শেষে ঘটনার বিস্তারিত জানা যাবে।
সূত্রের তথ্যমতে, বিজ্ঞান বিভাগের ওই শিক্ষার্থী প্রকৃতপক্ষে মাত্র একটি বিষয়ে পাস করেছিলেন। অথচ প্রকাশিত ফলাফলে তিনি জিপিএ-৪ দশমিক ৯৪ পেয়ে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে উত্তীর্ণ হন।
প্রকাশিত ফলাফলে বাংলায় (উভয় পত্র) ‘এ মাইনাস’ পেয়ে ১২০, রসায়নে ‘এ’ পেয়ে ৭৮ এবং আইসিটিতে ‘এ’ পেয়ে ৩৭ নম্বর দেখানো হয়। অন্য অধিকাংশ বিষয়ে ছিল ‘এ প্লাস’।
পুনঃনিরীক্ষণের সময় তিন বিষয়ের নম্বরে অমিল ধরা পড়ার পর শিক্ষার্থীর অন্যান্য উত্তরপত্রও তলব করা হয়। তদন্তে সেগুলোতেও নম্বরের অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। বাংলা প্রথমপত্র ছাড়া প্রায় সব বিষয়ের সৃজনশীল অংশের নম্বরে পার্থক্য রয়েছে।
শিক্ষার্থী পদার্থবিজ্ঞান, উচ্চতর গণিত এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ে পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করেছিল বলে শিক্ষা বোর্ড সূত্র জানিয়েছে। তবে শিক্ষার্থীর বাবা আবু শাহেদ হারুন এই আবেদন করার কথা অস্বীকার করেছেন।
তিনি বলেন, আমি বা আমার পরিবারের কেউ পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আবেদন করিনি। আমার বিরোধী কোনো পক্ষ আবেদন করলে হয়তো করতে পারে।
শিক্ষার্থীর মা রুবিনা আকতারও বলেন, তারা প্রকাশিত ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করে পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করেননি।
এই ঘটনার পর ফের প্রশ্নের মুখে পড়েছে শিক্ষা বোর্ডের কম্পিউটার সেন্টারের নিরাপত্তা ও ফলাফল তৈরির প্রক্রিয়া। কারণ এর আগেও ফলাফল পরিবর্তন ও নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একই জায়গাকে ঘিরে।
বোর্ডের সাবেক কর্মকর্তারা জানান, পরীক্ষার্থীদের উত্তরপত্রের নম্বর বিভিন্ন ধাপে কম্পিউটার সেন্টারের সার্ভারে সংরক্ষণ করা হয়। ফলাফল প্রকাশের আগে এসব তথ্য প্রক্রিয়াজাত করে চূড়ান্ত ফলাফল তৈরি করা হয়। এই প্রক্রিয়ার কোনো পর্যায়ে অননুমোদিতভাবে নম্বর পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়েছে কি না, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
এদিকে তদন্ত চলার মধ্যেই অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর ফলাফল শিক্ষা বোর্ডের সার্ভার থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। চলমান একাদশ শ্রেণির ভর্তি প্রক্রিয়ায় যাতে ওই শিক্ষার্থী আবেদন করতে না পারে, সে কারণেই ফলাফল সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে বোর্ড সূত্র জানিয়েছে।
এমনকি সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইআইএন নম্বরের বিপরীতে প্রকাশিত ফলাফলেও ওই শিক্ষার্থীর রোল নম্বর এখন আর দেখা যাচ্ছে না। ব্যক্তিগত রোল নম্বর দিয়েও ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন বলেন, বিষয়টি তদন্তাধীন। এ ঘটনা কীভাবে ঘটেছে তা নিয়ে আমরা তদন্ত কমিটির সদস্যরা কাজ করছি। আমরা কাউকে ছাড়ব না।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, ২৫ আগস্ট পুনঃনিরীক্ষণের সময়ই প্রথম অসঙ্গতিটি ধরা পড়ে। এরপর বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয় এবং তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
চাটগাঁ নিউজ/এসএ





