চাটগাঁ নিউজ ডেস্ক : পরিকল্পিত খাল পুনরুদ্ধার, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও সমন্বিত মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে চট্টগ্রামকে জলাবদ্ধতামুক্ত নগরে পরিণত করা হবে জানিয়েছেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এজন্য নগরের জলাবদ্ধতা সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধানে সংশ্লিষ্ট সব সেবা সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
বুধবার (১৭ জুন) টাইগারপাসের চসিক কার্যালয়ে ৮ম সাধারণ সভায় সভাপতির বক্তব্যে মেয়র এসব কথা বলেন।
মেয়র বলেন, গত শুক্রবারের টানা তিন থেকে চার ঘণ্টার ভারী বর্ষণের পরও নগরীর অধিকাংশ এলাকায় পানি জমে থাকেনি। শুধু কাতালগঞ্জ এলাকায় চলমান হিজড়া খাল সংস্কারকাজের কারণে কিছু সময় পানি জমে থাকলেও বৃষ্টি শেষ হওয়ার আধঘণ্টার মধ্যেই পানি নেমে গেছে। এটি নগরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নের ইতিবাচক ফল।
তিনি বলেন, গত এক দশকে মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চকবাজার, বাকলিয়া, আগ্রাবাদ ও কাতালগঞ্জসহ নগরের বিভিন্ন এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধতা দেখা যেত। কিন্তু গত বছর এসব এলাকার অধিকাংশ স্থানে জলাবদ্ধতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এ কারণেই আমরা বলেছি, চট্টগ্রামে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ জলাবদ্ধতা কমাতে সক্ষম হয়েছি।
ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পে ৩৬টি খালের কাজ হলেও বাস্তবে নগরে আরো অনেক খালের অস্তিত্ব রয়েছে। বহু খাল দখল, ভরাট ও অবৈধ স্থাপনার কারণে তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তাই শুধু পূর্বনির্ধারিত ২১টি নয়, নতুন পরিকল্পনায় ৪০টিরও বেশি খাল অন্তর্ভুক্ত করে ডিপিপি প্রস্তুত করা হচ্ছে। এই ৪০টির বেশি খাল পুনরুদ্ধার ও সংস্কারকাজ সম্পন্ন করতে পারলে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে জলাবদ্ধতা পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করা হচ্ছে। কোথায় কতক্ষণ পানি জমে থাকে, কারণ কী, ড্রেনেজ সমস্যা নাকি অবৈধ দখল- এসব তথ্য সংগ্রহ করে তাৎক্ষণিক সমাধান করা হবে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, নগরের ক্রমবর্ধমান বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন ল্যান্ডফিল অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। বর্তমানে আরেফিননগর ও হালিশহরে দুটি ল্যান্ডফিল থাকলেও ভবিষ্যৎ চাহিদা পূরণে আরও প্রায় ১০০ কানি জমি প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে জমি কেনার উদ্যোগ চলমান রয়েছে।
ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও জিকা ভাইরাস প্রতিরোধে গৃহীত কার্যক্রম তুলে ধরে মেয়র বলেন, গত ডিসেম্বর থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত আমেরিকান প্রযুক্তিনির্ভর বিটিআই লার্ভিসাইড ব্যবহার শুরু হয়েছে। এর ফলে গত ছয় মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং মৃত্যুহার শূন্যে নেমে এসেছে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। বাসা-বাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, টব, প্লাস্টিকের বোতল কিংবা অল্প পরিমাণ জমে থাকা পানিতেও এডিস মশার লার্ভা জন্ম নিতে পারে। তাই নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে।
মেয়র ট্রাফিক বিভাগ, ম্যাজিস্ট্রেসি টিম ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেন। তিনি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা, কাজীর দেউড়ি, নিউমার্কেট, আগ্রাবাদ, পতেঙ্গা ও ফয়’স লেকসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারির আহ্বান জানান।
কিশোর গ্যাং, মাদক ও সামাজিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করে মেয়র বলেন, নগরকে নিরাপদ শহরে পরিণত করতে হলে মাদক, কিশোর অপরাধ ও অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করতে হবে।
চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিন বলেন, নগরের ফুটপাত ও সড়ক অবৈধ দখলমুক্ত করতে জরিমানার হার খুবই নগণ্য। ম্যাজিস্ট্রেটরা উচ্ছেদ করে আসার পর বিকেলেই হকাররা আবার বসে যাচ্ছে। তাই এখন থেকে শুধু উচ্ছেদ নয়, প্রয়োজনে জরিমানা করতে হবে।
হালিশহর ও ফয়’সলেকসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় কিশোরদের গ্যাং কালচার ও মারামারি প্রকট আকার ধারণ করেছে, যা সাধারণ নাগরিকদের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি, অনেক আবাসিক এলাকায় নিজস্ব পকেট গেটগুলো বন্ধ করে রাখার কারণে সিটি করপোরেশনের অভ্যন্তরীণ সড়কগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না, ফলে মূল সড়কগুলোতে তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এই গেটগুলো উন্মুক্ত করার বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে কুলসুম বলেন, নগরের আইনশৃঙ্খলা ও কিশোর গ্যাং দমনের পাশাপাশি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ইস্যু হচ্ছে শহরে ভবঘুরে ও মানসিক বিকারগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়া। সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিদ্যমান ‘ভবঘুরে আইন’-এর আওতাভুক্ত করে এদেরকে পুনর্বাসন ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। নগরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও জননিরাপত্তার স্বার্থে এদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং যথাযথ ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা প্রয়োজন।
জবাবে মেয়র বলেন, ডে-কেয়ার সেন্টারের পাশাপাশি ভবঘুরে ও মানসিক বিকারগ্রস্তদের চিকিৎসার জন্য একটি ‘মানসিক রোগ বিকাশ কেন্দ্র’ এবং প্রবীণদের জন্য ‘জেরিয়াট্রিক কেয়ার’ বা ওল্ড এজ হোম নির্মাণ করা হবে।
ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, বৃহত্তর চট্টগ্রামের রোগীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে ওলিখা মসজিদ থেকে প্রবর্তক মোড় পর্যন্ত এলাকাকে ‘জিরো ট্রাফিক জোন’ করা হবে। এই সড়কের পাশে কোনো অ্যাম্বুলেন্স, লাশের গাড়ি, রিকশা, সিএনজি বা ভাসমান ডাব বা ফলের দোকান দাঁড়াতে পারবে না। বিশেষ করে বিকেল ৪টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বেসরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের চেম্বারে রোগীর স্বজনদের অতিরিক্ত ভিড় থাকে। এই সময়ে ট্রাফিক পুলিশ কঠোর অবস্থানে থাকতে হবে। সড়ক থেকে ফুটপাতের ডাব ও ফল বিক্রেতাদের উচ্ছেদ করে চমেক হাসপাতালের পূর্ব গেটে নির্দিষ্ট স্থানে পুনর্বাসন করা হবে।
চাটগাঁ নিউজ/এসএ





