চাটগাঁ নিউজ ডেস্ক: দেশের শতবর্ষী প্রাচীন ব্যবসায়ী সংগঠন দি চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৩ সালের ৩০ মার্চ। দীর্ঘ সময় পরও নতুন নির্বাচন না হওয়ায় প্রশাসক দিয়েই চলছে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ওই বছরের ৯ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম চেম্বারের প্রশাসকের দায়িত্ব নেন তৎকালীন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) মুহাম্মদ আনোয়ার পাশা।
তাঁর এক বছর মেয়াদ শেষে ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য সংগঠন-১ অনুবিভাগের উপসচিব চৌধুরী সামিয়া ইয়াসমীনের সই করা আদেশে নতুন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পান চট্টগ্রামের অতিরিক্ত কমিশনার (সার্বিক) মোহাম্মদ নূরুল্লাহ নূরী। তাঁর মেয়াদ শেষ হলে চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি থেকে নির্বাচন কার্যক্রম সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) মো. মোতাহের হোসেনকে।
এভাবে গত ২০ মাসেরও বেশি সময় ধরে প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে চেম্বারের কার্যক্রম। মামলা-পাল্টা মামলায় ঝুলে আছে নির্বাচন প্রক্রিয়া, যা সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে।
উচ্চ আদালতের নির্দেশে ইতোমধ্যে পাঁচবার নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। সর্বশেষ চলতি মাসের ২২ এপ্রিল চট্টগ্রাম চেম্বারের নির্বাচনী তফসিল বাতিল করে নতুন তফসিল প্রণয়ন ও ঘোষণার নির্দেশ দেয় এফবিসিসিআইয়ের সালিসি ট্রাইব্যুনাল।
ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান মিসেস নাসরিন বেগম এবং সদস্য এএসএম কামাল উদ্দিন ও ছায়েদ আহম্মদ ২০২৫ সালের ১১, ১২ ও ১৩ নম্বর মামলার রায়ে এ নির্দেশনা দেন।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্বাচন নিয়ে জটিলতা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। উচ্চ আদালতে চলমান মামলা, চেম্বারের সংঘবিধি (আর্টিক্যালস অব অ্যাসোসিয়েশন) সংশোধন এবং ভোটার তালিকা হালনাগাদসহ নানা বিষয় এতে জড়িত।
নির্বাচন স্থগিতের পেছনে যাদের নাম বারবার সামনে এসেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন ট্রেড গ্রুপ থেকে নির্বাচন করতে আগ্রহী গার্মেন্টস পণ্য সরবরাহকারী মুহাম্মদ বেলাল হোসেন, একটি প্যানেলের নেতা এস এম নুরুল হক এবং সদস্য আজিজুল হক। নির্বাচন বোর্ড তাঁদের আবেদন খারিজ করলে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে তারা উচ্চ আদালত ও ট্রাইব্যুনালে আইনি লড়াই শুরু করেন।
মামলার বাদী হিসেবে রয়েছেন অ্যাসোসিয়েট সদস্য এস এম নুরুল হক, অর্ডিনারি সদস্য মুহাম্মদ বেলাল হোসেন ও মুহাম্মদ আজিজুল হক। ট্রাইব্যুনালের তথ্যমতে, মুহাম্মদ বেলাল হোসেন নিজেকে কখনো সাধারণ সদস্য, আবার কখনো চট্টগ্রাম গার্মেন্ট এক্সেসরিজ গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। একই ব্যক্তি ভিন্ন দুটি শ্রেণির সদস্য হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন না—এই যুক্তিতে তাঁর আবেদন খারিজ করা হয়।
বেলাল হোসেনের অভিযোগ, বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা অনুসরণ না করে ভোটার তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে, যার কারণে বারবার নির্বাচন কার্যক্রম স্থগিত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের কার্যক্রম মূলত আর্টিক্যালস অব অ্যাসোসিয়েশন অনুযায়ী পরিচালিত হয়। এ অনুযায়ী অর্ডিনারি গ্রুপের ১২ জন এবং অ্যাসোসিয়েট গ্রুপের ৬ জন পরিচালক সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন। টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের ৬ জন পরিচালক সমঝোতার ভিত্তিতে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। পরে এই ২৪ জন পরিচালকের ভোটে সভাপতি, সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়।
বর্তমানে চেম্বারে সাধারণ সদস্য ৪ হাজার ১ জন, সহযোগী সদস্য ২ হাজার ৭৬৪ জন, শহর সমিতির সদস্য ৫ জন এবং ট্রেড গ্রুপের সদস্য ১০ জন—মোট ৬ হাজার ৭৮০ জন সদস্য রয়েছেন।
নির্বাচনে দুটি প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছে। একটি এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক আমিরুল হকের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড বিজনেস ফোরাম এবং অন্যটি সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি এস এম নুরুল হকের নেতৃত্বাধীন সমমনা পরিষদ।
সর্বশেষ ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী গত ৪ এপ্রিল চার ক্যাটাগরিতে ২৪ জন পরিচালক নির্বাচিত হওয়ার কথা ছিল। পরে তাঁদের ভোটে সভাপতি, সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সহ-সভাপতি নির্বাচনের কথা ছিল। কিন্তু ২২ এপ্রিলের রায়ে সেই তফসিল বাতিল করে সরাসরি নির্বাচনের নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল।
বর্তমানে উচ্চ আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
এদিকে, চেম্বার নির্বাচন বোর্ডের প্রধান মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আর্টিক্যালস অব অ্যাসোসিয়েশন সংশোধন ছাড়া সরাসরি ভোটে নির্বাচন সম্ভব নয়। কিন্তু নির্বাচিত বোর্ড না থাকায় সেটি সংশোধনের সুযোগও নেই। এখন আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি।’
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত নির্বাচন সম্পন্ন হলে ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা এর সুফল পাবেন।
চাটগাঁ নিউজ/এমকেএন





