আন্তর্জাতিক ডেস্ক: জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া, কম মজুরি এবং আবাসনসংকটের প্রতিবাদে ফ্রান্সের পর এবার বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে ইতালি, বেলজিয়াম ও পর্তুগালে।
গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) থেকে ইউরোপের চারটি দেশে পৃথক বিক্ষোভ কর্মসূচিতে লাখ লাখ মানুষ অংশ নেন। এসব বিক্ষোভে কোথাও শান্তিপূর্ণ মিছিল হলেও কয়েকটি শহরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, দোকানপাটে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় বিক্ষোভের পাশাপাশি ইতালি, বেলজিয়াম ও পর্তুগালেও সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমেছেন। দেশভেদে বিক্ষোভের কারণ ও দাবি আলাদা হলেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষা খাতে সংকট, কম মজুরি এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষের বিষয়গুলোতে মিল রয়েছে।
ফ্রান্সে কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলছিল। স্কুলের অব্যবস্থাপনা, শিক্ষকস্বল্পতা, শিক্ষার পরিবেশের অবনতি এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তি-সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে পরে যুক্ত হন শ্রমিক, ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ।
দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, শনিবারের বিক্ষোভে পাঁচ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নেন। তবে আন্দোলন একপর্যায়ে সহিংস হয়ে উঠলে বিভিন্ন শহরে দোকানপাটে লুটপাট, সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এসব ঘটনায় প্রায় ২৪০০ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসসহ মার্সেই, লিয়ঁ, বোর্দো ও লিমোজের মতো শহরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। লিমোজে ঐতিহাসিক সিটি হল ভবনে আগুন দেওয়া হয়। বিভিন্ন স্থানে বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের দোকান ও সুপারমার্কেটও লুটপাটের শিকার হয়।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশজুড়ে বিভিন্ন শহরকে এমন এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির পরিণতি মোকাবিলা করতে হয়েছে, যা আধুনিক ফ্রান্সের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ দাঙ্গার ঘটনাগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। শনিবার প্রায় এক হাজার পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে সাতজন গুরুতর আহত।
ইতালি
ইউরোপের আরেক দেশ ইতালিতেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। শনিবার দেশটির মিলান শহরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও যুদ্ধবিরোধী দাবিতে ‘ইতালিয়া ইন পিয়াজ্জা’ ব্যানারে আয়োজিত একটি মিছিল শুরুতে শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরে একপর্যায়ে সহিংসতায় রূপ নেয়।
ইতালীয় সংবাদমাধ্যম স্কাই টিজি২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, মুখোশধারী কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে পাথর ও অন্যান্য বস্তু ছুড়ে মারেন, দোকানের জানালা ভাঙচুর করেন এবং বিভিন্ন স্থানে আগুন ধরিয়ে দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। সংঘর্ষে অন্তত দুই পুলিশ সদস্য আহত হন এবং প্রায় ৫০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়।
মিলান ছাড়াও তুরিন, বোলোনিয়া, ব্রেসিয়া এবং বেরগামোতেও বিক্ষোভ করেছেন কয়েক হাজার মানুষ। এসব শহরেও বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, ‘বিক্ষোভ করা মানুষের অধিকার, কিন্তু শহরে আগুন জ্বালানো বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা গ্রহণযোগ্য নয়’।
মিলানের মেয়র জিউসেপ্পে সালা বিক্ষোভের পেছনে থাকা মানুষের অসন্তোষকে বোধগম্য বলে উল্লেখ করলেও পুলিশের ওপর হামলা ও শহরের সম্পত্তি ধ্বংসের নিন্দা জানিয়েছেন।
বেলজিয়াম
এদিকে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ফি বৃদ্ধি এবং উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকার সীমিত হয়ে পড়ার আশঙ্কায় শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেন। কয়েক সপ্তাহ ধরেই সেখানে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলছিল।
শনিবারের কর্মসূচিতে বিক্ষোভকারীদের একাংশের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় শহর লিয়েজেও বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান ব্যবহার করা হয়।
তবে এসব কর্মসূচিতে মোট কতজন অংশ নিয়েছেন, তা জানায়নি পুলিশ।
পর্তুগাল
এছাড়াও পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি এবং আবাসনসংকটের প্রতিবাদে কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশ হাজার মানুষ রাস্তায় নামেন। দেশটির প্রধান শ্রমিক সংগঠনের আহ্বানে আয়োজিত এই বিক্ষোভে মজুরি ও পেনশন বাড়ানো, জ্বালানির দাম কমানো এবং সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়।
আলজাজিরা জানিয়েছে, পর্তুগালে আবাসনসংকট উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। ২০১৭ সালের পর দেশটিতে বাড়ির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে এবং নতুন ভাড়ার চুক্তির ক্ষেত্রেও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে তরুণ, নিম্ন আয়ের পরিবার ও শহরে বসবাসকারী সাধারণ মানুষের পক্ষে বাড়ি কেনা কিংবা ভাড়া নেওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে বিক্ষোভকারীদের দাবির বিষয়ে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
তবে আন্দোলনকারীরা বলছেন, নীতিনির্ধারকেরা সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক দুর্ভোগ যথাযথভাবে সমাথানের চেষ্টা করছেন না। এতে আয় বৃদ্ধির তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বাড়ায় বহু পরিবার আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
প্রসঙ্গত, চলমান বিক্ষোভ ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর সরকারের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন ও নীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং প্যারিসের এইচইসি বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক আলবার্তো আলেমানো আলজাজিরাকে বলেন, ফ্রান্স এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এবং সেখানকার অসন্তোষ অন্য দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং পড়াশোনা শেষে কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে অভিন্ন উদ্বেগ তৈরি করেছে’।
অধ্যাপক আলেমানো সতর্ক করেন, অর্থনৈতিক চাপ ও সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষের সমাধান না হলে ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়তে পারে। গ্রিস, জার্মানি ও অস্ট্রিয়াতেও আন্দোলনের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
সূত্র: আলজাজিরা, আনাদোলু
চাটগাঁ নিউজ/জেএইচ






