২০২৭ সালের জুনে চালু হবে চট্টগ্রামের প্রথম আধুনিক স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা

নিজস্ব প্রতিবেদক : চট্টগ্রাম নগরীর পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অবশেষে আসছে বড় পরিবর্তন। প্রায় ৫ হাজার ২১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রথম স্যুয়ারেজ প্রকল্পের ৭৮ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের জুনে চালু হবে প্রকল্পটি।

চালু হলে নগরীর প্রায় ২০ লাখ মানুষ, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ২০ থেকে ২৫ শতাংশ আধুনিক স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার আওতায় আসবেন। ওয়াসার দাবি, এটি হবে শুধু চট্টগ্রাম নয়, সারাদেশের প্রথম আধুনিক স্যুয়ারেজ প্রকল্প।

তবে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে প্রায় এক বছর পিছিয়ে যাচ্ছে প্রকল্পের বাস্তবায়ন। বাড়ছে ব্যয়ও।

৩ হাজার ৮০৮ কোটি থেকে ব্যয় ৫ হাজার ২১৯ কোটি
চট্টগ্রাম ওয়াসার মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী পুরো নগরীকে ছয়টি স্যুয়ারেজ জোনে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ধাপে জোন-১-এর জন্য বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এই প্রকল্প। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয় প্রকল্পের কাজ। শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ৮০৮ কোটি ৫৮ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। পরে সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদনের মাধ্যমে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো হয় আরও প্রায় ১ হাজার ৪১০ কোটি টাকা। ফলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৫ হাজার ২১৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৩৭ শতাংশ।

কোথায় হচ্ছে প্রকল্প?
নগরীর হালিশহরে ওয়াসার প্রায় ১৬৩ একর জায়গায় নির্মাণ করা হচ্ছে স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট। জোন-১-এর আওতায় রয়েছে হালিশহর, সাগরিকা, সল্টগোলা ক্রসিং, শেখ মুজিব রোড, কদমতলী, সদরঘাট, আগ্রাবাদ, দেওয়ানহাট, লালখান বাজার, নিউমার্কেট, কোতোয়ালী, জামালখান ও আন্দরকিল্লাসহ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু এলাকা।

এই এলাকার বাসাবাড়ি থেকে পয়ঃবর্জ্য সংগ্রহ করে পাইপলাইনের মাধ্যমে নিয়ে যাওয়া হবে শোধনাগারে। সেখানে পরিশোধনের পর শোধিত পানি সাগরে ফেলার পরিকল্পনা রয়েছে।

২৭২ কিলোমিটার পাইপলাইন, হয়েছে ১৮২ কিলোমিটার
প্রকল্পের আওতায় নগরীতে মোট ২৭২ কিলোমিটার গভীর ও অগভীর পয়ঃপাইপলাইন স্থাপনের কথা রয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে স্থাপন করা হয়েছে ১৮২ কিলোমিটার। অর্থাৎ এখনো বাকি রয়েছে প্রায় ৯০ কিলোমিটার পাইপলাইন।

এ ছাড়া ২৮ হাজার বাড়িতে পয়ঃসংযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ১৬ হাজার বাড়িতে সংযোগ দেওয়া হয়েছে। হালিশহরের ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের সিভিল কাজের ৯৫ শতাংশ এবং ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল কাজের প্রায় ৬০ শতাংশ শেষ হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রকল্পের অগ্রগতি ৭৮ শতাংশ।

বর্ষায় থমকে যায় কাজ
প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নগরীর সড়ক কেটে পাইপলাইন স্থাপন। বর্ষাকালে সড়ক কাটার কাজ কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে আসন্ন শুকনো মৌসুমকে কাজে লাগিয়ে অবশিষ্ট পাইপলাইন স্থাপনের কাজ দ্রুত শেষ করতে চায় ওয়াসা।

চট্টগ্রাম ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্প পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি চালুর লক্ষ্য নিয়ে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। শুকনো মৌসুমে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সহযোগিতায় কাজের গতি বাড়ানো হবে।

এক বছর পিছিয়ে গেল চালুর সময়
প্রকল্পটির কাজ চলতি বছরের জুনের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে তা শেষ করা সম্ভব হয়নি। নানা কারণে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম জানিয়েছেন, বর্তমানে কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে এবং ২০২৭ সালেই প্রকল্পটি চালু করা হবে।

২০ লাখ মানুষের জন্য নতুন ব্যবস্থা
১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম ওয়াসার ইতিহাসে এটিই প্রথম স্যুয়ারেজ প্রকল্প। দক্ষিণ কোরিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তায়ং ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।

তবে একটি প্রকল্প দিয়ে পুরো নগরীর স্যুয়ারেজ সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। প্রথম ধাপে জোন-১-এর ২০ থেকে ২৫ শতাংশ মানুষ এই ব্যবস্থার আওতায় আসবেন। পরবর্তী সময়ে মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী অন্য জোনগুলোতেও স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

দশকের পর দশক ধরে চট্টগ্রামের বড় একটি অংশের পয়ঃবর্জ্য যাচ্ছে খাল, নালা, নদী ও সাগরে। এর ফলে দূষিত হচ্ছে নগরীর জলাধার ও পরিবেশ। সেই বাস্তবতায় ৫ হাজার ২১৯ কোটি টাকার এই প্রকল্প নগরবাসীর জন্য নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে।

কিন্তু প্রত্যাশার সঙ্গে প্রশ্নও আছে—বাড়তি ব্যয়ের পরও প্রকল্পটি নির্ধারিত নতুন সময়সীমার মধ্যে শেষ হবে তো? আর প্রথম ধাপে ২০ লাখ মানুষকে স্যুয়ারেজ ব্যবস্থায় আনার পর পুরো নগরীকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনতে পরবর্তী ধাপগুলো কতটা দ্রুত বাস্তবায়ন করা যাবে?

চট্টগ্রামের আধুনিক নগরায়ণের জন্য তাই শুধু প্রকল্প শেষ করাই নয়, সময় ও ব্যয়ের সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কার্যকর স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

চাটগাঁ নিউজ/এসএ

Scroll to Top