সরোজ আহমেদ : আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে বিশ্বের অনেক দেশ আগে থেকেই গড়ে তোলা বিশেষ ‘রিজার্ভ ফান্ড’ বা স্থিতিশীলতা তহবিল ব্যবহার করে বাজারে এর প্রভাব নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। ফলে হঠাৎ করেই ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়ানোর প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে এমন কোনো তহবিল না থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেই তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের বাজারে। ফলে বাড়ে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম, যার প্রভাব পড়ে পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে কৃষি, শিল্প ও নিত্যপণ্যের বাজারেও।
সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে প্রথমবারের মতো একটি জেনারেল রিজার্ভ ফান্ড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই তহবিল গড়ে উঠলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেলেও দেশের বাজারে তার অভিঘাত অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
এক দশকে ৫১ হাজার কোটি টাকার বেশি মুনাফা
বিপিসির আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত সংস্থাটি মোট ৫১ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। অর্থাৎ গড়ে বছরে প্রায় ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা লাভ করেছে রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠান। এত বড় অঙ্কের মুনাফা অর্জনের পরও এতদিন কোনো আপৎকালীন তহবিল না থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির সময় সরকারকে কখনও ভর্তুকি দিতে হয়েছে, আবার কখনও জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে হয়েছে।
৫ হাজার কোটি টাকার প্রাথমিক তহবিল
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংরক্ষিত মুনাফা থেকে প্রাথমিকভাবে ৫ হাজার কোটি টাকা স্থানান্তর করে একটি জেনারেল রিজার্ভ ফান্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিপিসি আইন-২০১৬ এবং বিপিসি রুলস-১৯৭৬ অনুযায়ী জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অনুমোদন নিয়ে এই তহবিল গঠন করা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে প্রতি বছর কর-পরবর্তী মুনাফা থেকে ৫০০ কোটি টাকা অথবা মোট মুনাফার ২০ শতাংশ—যেটি বেশি হবে, সেটি এই তহবিলে জমা করা হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্থানের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। গত জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত বিপিসির পরিচালনা পর্ষদের সভায় বিষয়টি ফাইন্যান্স অ্যান্ড অডিট কমিটির মাধ্যমে পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কোথায় ব্যয় হবে এই অর্থ?
প্রস্তাবিত নীতিমালা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে এই তহবিল থেকে আমদানি ব্যয়ের একটি অংশ বহন করা হবে। পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখা, কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নেও এই অর্থ ব্যবহার করা যেতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ, বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার চাপের সময় এই তহবিল দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কী বলছেন বিপিসির পরিচালক?
বিপিসির পরিচালক (অর্থ) ও সরকারের যুগ্ম সচিব নাজনীন পারভীন বলেন, বিপিসি তেল বিক্রি করে যে মুনাফা অর্জন করে, তার বড় অংশ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পে ব্যবহার করা হয়। তবে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আপৎকালীন ব্যবহারের জন্য আলাদা একটি তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তার ভাষায়, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলেও এই তহবিল থেকে অর্থ ব্যয় করে সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা এবং বাজারে চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কী বলছে?
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি নিরাপত্তা নীতিমালা অনুযায়ী অধিকাংশ দেশই নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জ্বালানি মজুত রাখে। আন্তর্জাতিক এনার্জি পলিসিতে প্রায় ৬০ দিনের জ্বালানি মজুত সক্ষমতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যদিও বাংলাদেশ এখনও সেই সক্ষমতায় পুরোপুরি পৌঁছাতে পারেনি।
বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম যুদ্ধ, উৎপাদন হ্রাস, ওপেক প্লাসের সিদ্ধান্ত কিংবা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দ্রুত ওঠানামা করে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য কেবল মজুত নয়, আর্থিক সুরক্ষা তহবিলও সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মত
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, বিপিসি যেহেতু প্রতিবছরই মুনাফা করেছে, তাই অনেক আগেই মুনাফার একটি অংশ আপৎকালীন তহবিলে সংরক্ষণ করা উচিত ছিল।
তার মতে, আপৎকালীন তহবিলের উদ্দেশ্যই হলো সংকটের আগেই প্রস্তুতি নেওয়া। আগে থেকে এমন একটি ফান্ড থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির সময় জনগণের ওপর অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমানো সম্ভব হতো।
ভোক্তাদের প্রত্যাশা
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ও ভোক্তা অধিকারকর্মী এস এম নাজের হোসাইন বলেন, প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেও বিপিসি এতদিন কোনো ঝুঁকি মোকাবিলা তহবিল গড়ে তুলতে পারেনি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেই জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি কিংবা সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, রিজার্ভ ফান্ড চালু হলে সরকার ও ভোক্তা—উভয়ের ওপর চাপ কমবে। দেরিতে হলেও এ ধরনের উদ্যোগ ইতিবাচক এবং সময়োপযোগী।
অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাবের আশা
অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি কার্যকর রিজার্ভ ফান্ড শুধু জ্বালানি খাত নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিকেও স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে। কারণ জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি সরাসরি পরিবহন ব্যয়, কৃষি উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্প খাতের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এর প্রভাব পড়ে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, নিয়মিত অর্থ সংযোজন, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা এবং নির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে পরিচালিত হলে এই রিজার্ভ ফান্ড ভবিষ্যতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার ধাক্কা থেকে সাধারণ ভোক্তা ও জাতীয় অর্থনীতিকে সুরক্ষা দিতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
চাটগাঁ নিউজ/এসএ





