চাটগাঁ নিউজ ডেস্ক : চট্টগ্রাম বন্দরে খালি কনটেইনার স্থানান্তরের (এম্পটি কনটেইনার হ্যান্ডলিং) জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি নতুন ঠিকাদার নিয়োগের একটি দরপত্র নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বন্দর সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিশেষ দুটি প্রতিষ্ঠানকে একক সুবিধা দিতে দরপত্রে এমন কিছু ‘কঠিন শর্ত’ জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যা উন্মুক্ত ও সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার পরিপন্থি। এর ফলে বন্দরে আবারও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর একাধিপত্য বা সিন্ডিকেট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা ও স্টেকহোল্ডাররা।
জানা গেছে, ১৪ জুন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ পাঁচ বছরের জন্য নতুন ঠিকাদার নিয়োগের দরপত্র প্রকাশ করে। গোপনে একটি অপরিচিত পত্রিকায় দরপত্রের শর্তাবলি প্রকাশের পরই সাধারণ স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বিতর্কিত এই দরপত্রে বলা হয়েছে আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে বিগত ১০ বছরের মধ্যে দেশের যেকোনো সমুদ্রবন্দরে নিজস্ব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে অন্তত ৫০ কোটি টাকার কাজের একক অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। বার্ষিক টার্নওভার থাকতে হবে ন্যূনতম ১২ কোটি টাকা এবং সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতা (লিকুইড অ্যাসেট) থাকতে হবে ন্যূনতম ১০৫ কোটি টাকা।
বন্দর ব্যবহারকারীদের দাবি, এই একটি শর্তেই দেশের শত শত অভিজ্ঞ লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান ও আইসিডি (অফডক) অপারেটর প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা দূরের কথা অংশগ্রহণও করতে পারবে না। মূলত টিকে থাকবে দুটি প্রতিষ্ঠান— বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিমের ‘এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস’ ও বিতর্কিত ব্যবসায়ী তরফদার রুহুল আমীনের ‘সাইফ পাওয়ারটেক’। কারণ দেশের বর্তমান বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কেবল এই ধরনের শর্ত পূরণ করার সক্ষমতা এই দুই প্রতিষ্ঠানের রয়েছে।
সাধারণ শিপিং এজেন্ট ও বন্দর ব্যবহারকারীরা উদ্বেগের সাথে বলেন, এই দরপত্রটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেন অন্য কোনো যোগ্য বা নতুন প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেই না পারে। এ ধরনের সীমাবদ্ধ শর্তের কারণে অন্য যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে, যা উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার পরিপন্থি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ব্যবসায়ী নেতা জানান, ‘৫০ কোটি টাকার একক কাজের অভিজ্ঞতা এবং ১০৫ কোটি টাকার আর্থিক সক্ষমতার শর্ত দেওয়ার মানে হলো শুরুতেই বাকি সবাইকে প্রতিযোগিতার বাইরে ঠেলে দেওয়া। এটি মূলত একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার ছক।
অভিযোগ উঠেছে, নতুন দরপত্রে আর্থিক যোগ্যতার মানদণ্ডেও ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগের শিডিউলে গড় বার্ষিক টার্নওভার মাত্র এক কোটি টাকা থাকলেও এবার তা বাড়িয়ে ১২ কোটি টাকা করা হয়েছে। একইভাবে লিকুইড অ্যাসেট বা ব্যাংক ক্রেডিট সুবিধার শর্ত বাড়িয়ে নতুন করে ‘ন্যূনতম সক্ষমতা’ ১০৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগের কোনো শিডিউলে এমন শর্ত ছিল না।
চার বছরের পরিবর্তে পাঁচ বছরের চুক্তি হলেও কাজের মেয়াদ মাত্র এক বছর বেড়েছে। সেই তুলনায় আর্থিক যোগ্যতার মানদণ্ড ৭ থেকে ১২ গুণ পর্যন্ত বাড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ব্যবসায়ীরা।
নতুন শিডিউলে আরও বলা হয়েছে, দরদাতাকে নিজস্ব ব্র্যান্ড নিউ এম্পটি হ্যান্ডলার ও ট্রাক্টর-ট্রেইলার ব্যবহার করতে হবে। শুধু তাই নয়, যন্ত্রপাতির উৎপাদনকাল দরপত্র প্রকাশের তারিখের এক বছরের বেশি পুরোনো হতে পারবে না। অর্থাৎ সম্পূর্ণ নতুন ব্র্যান্ডের যন্ত্রপাতি কিনতে হবে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, যন্ত্রপাতির উৎপাদনশীলতা ৭০ শতাংশের নিচে নামলে নিজ খরচে তা প্রতিস্থাপন করার শর্তও। আগের শিডিউলে ২০টি নিজস্ব এবং ১৫টি ভাড়ায় নেওয়া ট্রাক্টর-ট্রেইলার দেখানোর সুযোগ ছিল। ব্যবহৃত কিন্তু কার্যক্ষম যন্ত্রপাতি নিয়েও অংশগ্রহণে বাধা ছিল না।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বর্তমানে দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান ‘এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস’ নিজেই বছরের পর বছর মেয়াদোত্তীর্ণ ও পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এমন অভিযোগ থাকলেও নতুন আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের জন্য রাখা হয়েছে এই কঠিন শর্ত।
তারা আরও বলেন, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন ফ্লিট কেনা এবং টেন্ডার পাওয়ার আগেই এমন বিনিয়োগ করা অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে এই শর্তও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা সীমিত করার আরেকটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
আগের টেন্ডারে শুধু প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পাঁচ কর্মকর্তার জীবনবৃত্তান্ত জমা দিতে হতো। কিন্তু নতুন শিডিউলে অপারেশনাল প্রধান, টিম লিডার, ফাইন্যান্স ম্যানেজার, ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজার, অপারেশন ম্যানেজারসহ একাধিক পদে নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ছাড়া তিন শিফটে কাজ চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় টেকনিশিয়ান, অন্তত ১২ জন দক্ষ ইকুইপমেন্ট অপারেটর এবং ৪০ জন দক্ষ ট্রাক্টর-ট্রেইলার চালক নিয়োগের শর্তও রাখা হয়েছে।
উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে এই বিতর্কিত শর্তগুলো শিথিল করে দরপত্রটি পুনরায় মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছেন বন্দর সংশ্লিষ্টরা। অন্যথায় বন্দরের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ব্যাহত হবে এবং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ তৈরি হবে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
এদিকে, এই বিতর্কিত শর্তাবলির কারণে বন্দরে মুক্ত প্রতিযোগিতা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা জানিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত আবেদন জমা দিয়েছে বন্দর পরিচালনাকারী মালিকদের শীর্ষ সংগঠন ‘বার্থ অপারেটরস, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন’ সভাপতি ফজলে ইকরাম চৌধুরী।
চিঠিতে বলা হয়, এই বিশেষ শর্তগুলো বলবৎ থাকলে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া দেশের আর কোনো সক্ষম দরদাতার অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে না। এতে বন্দর কর্তৃপক্ষ সবচেয়ে সাশ্রয়ী মূল্যে কাজ পাওয়ার সুযোগ হারাবে এবং উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা থাকলে যে অর্থ সাশ্রয় হতো তা থেকে বঞ্চিত হবে সরকার।
চিঠিতে আরও বলা হয়, বারবার টেন্ডার ভেস্তে যাওয়ার সুযোগে বর্তমানে দায়িত্বে থাকা পুরোনো প্রতিষ্ঠানটি ২০১৩ সাল থেকে আজ অবধি মেয়াদোত্তীর্ণ ও পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়ে কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়াই বন্দরে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে অবিলম্বে নতুন দরপত্রের বিতর্কিত শর্তগুলো বাতিল করে ২০১৩ ও ২০১৭ সালের মতো সহজ ও উন্মুক্ত শর্ত বহাল রাখার দাবি জানানো হয়েছে ওই চিঠিতে।
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে চার বছরের জন্য কাজটি পায় ‘এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস’। প্রতিষ্ঠানটির মালিক বিএনপির বিএনপির বর্তমান সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম। ২০১৭ সালে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন টেন্ডার ডাকা হলেও তা মামলা জটিলতায় আটকে যায়। ফলে বাধ্য হয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) আবারও এভারেস্টকেই দায়িত্ব দেয়।
২০২০ সালেও একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এরপর ২০২৩ সালে নতুন দরপত্রে এভারেস্ট ও তরফদার রুহুল আমীনের সাইফ পাওয়ারটেক অংশ নেয়। সেখানে সাইফ পাওয়ারটেক সর্বনিম্ন দরদাতা হলেও পরবর্তী আইনি জটিলতায় সেই টেন্ডারও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে আবারও সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে আগের প্রতিষ্ঠান ‘এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস’ কাজ চালিয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ায় বন্দর প্রতি বছর এভারেস্টকে পরিশোধ করছে ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা, প্রতি ছয় মাসে ৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় এমন কিছু ফাঁকফোকর রাখা হয়, যাতে মামলা করে সহজেই পুরো প্রক্রিয়া স্থগিত করা সম্ভব হয়। আর প্রতিবারই শেষ পর্যন্ত শাহাদাত হোসেন সেলিমের প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতা ছাড়াই কাজ ধরে রাখে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগ আমল থেকেই তরফদার রুহুল আমিন ও শাহাদাত হোসেন সেলিমের মধ্যে অলিখিত সমঝোতা চলে আসছে। ফলে রুহুল আমীন তরফদার কখনও শাহাদাত হোসেন সেলিমের পথের কাঁটা হয়ে ওঠেনি। তাছাড়া বন্দরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বেশিরভাগই তাদের সুবিধাভোগী।
টেন্ডার নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য ও এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেসের কর্ণধার শাহাদাত হোসেন সেলিম জানান, ‘পিপিআরের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করে সিপিটিইউর নির্দেশনা মোতাবেক টেন্ডার আহ্বান করা হয়। এতে কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই।’
সাইফ পাওয়ারটেক ও এভারেস্টকে সুবিধা দিতে দরপত্রটির শর্তগুলো তৈরি করা হয়েছে- ব্যবসায়ীদের এমন মন্তব্যের জবাবে শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, ‘কাকতালীয়ভাবে এটা মনে হতে পারে। তবে এই অভিযোগ সঠিক নয়। এটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিচালক (পরিবহন) গোলাম মো. সারওয়ারুল ইসলাম বিষয়টি নিয়ে কথা বলা বারণ আছে বলে জানান।
চাটগাঁ নিউজ/এসএ





