সবকিছু দিয়েও প্রাণে বাঁচতে চেয়েছিল কিশোর— তবু কুপিয়ে হত্যা

চাটগাঁ নিউজ ডেস্ক : প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে প্রতিবেশীর অটোরিকশায় চড়ত কিশোর। একপর্যায়ে প্রতিবেশী অটোরিকশাচালক জানতে পারেন, ওই কিশোর ইয়াবা বিক্রির সঙ্গে যুক্ত। এরপর সেই কিশোরের কাছে ইয়াবা বিক্রির লাভের টাকার একটি অংশ দাবি করে বসেন। তবে লাভের অংশ দিতে রাজি হয়নি কিশোর। এতে ক্ষিপ্ত হন অটোরিকশাচালক। আরও কয়েকজন ব্যক্তির সহায়তায় ওই কিশোরকে কোদাল দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেন তিনি। লাশটি গুম করতে পাহাড়ে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল। তবে ঘটনার তিন সপ্তাহের মাথায় লাশটি টেনেহিঁচড়ে বের করে শিয়ালের দল। তখন কিশোরের মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পারেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

সম্প্রতি  এ মামলায় মো. পারভেজ (২৪) নামে এক অটোরিকশাচালককে গ্রেপ্তার করে চট্টগ্রামের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল হারুনের আদালতে হাজির করা হলে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

জবানবন্দিতে বলা হয়, ২০২২ সালের ১৭ জুলাই রাতে গ্রামে বন্ধুদের সঙ্গে ক্যারম খেলছিল ওই কিশোর। অটোরিকশাচালক তাকে ডেকে আনতে সাকিব নামের এক তরুণকে সেখানে পাঠান। সাকিব ওই কিশোরকে ডেকে স্থানীয় একটি কলেজের মাঠে নিয়ে যান। সেখানে পারভেজ, সাকিবসহ আরও কয়েকজন ওই কিশোরকে ঘিরে ধরে ইয়াবা এবং টাকা দাবি করেন। কিশোরটির পকেট থেকে একটি টাকার বান্ডিলও ছিনিয়ে নেন তাঁরা। পরে ওই কিশোরকে মারধর করতে করতে পাশের একটি সেতুতে নিয়ে যাওয়া হয়। একপর্যায়ে সেতুর ওপর ওই কিশোরের হাত-পা চেপে ধরে রাখেন তাঁরা। এ সময় সেই কিশোর বলতে থাকে, ‘আমার সব নিয়ে যাও, তবু প্রাণে বাঁচতে দাও।’ তখন হামলাকারীদের মধ্যে হাসান নামের একজন বলেন, ‘তাকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। বেঁচে থাকলে সবাইকে আমাদের নাম বলে দেবে।’ এরপর ধারালো কোদাল দিয়ে কিশোরটির পা ও গলায় আঘাত করা হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরে মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় কিশোরটির। হত্যার পর প্রমাণ গোপন করতে পাহাড়ে গর্ত খুঁড়ে বিচ্ছিন্ন মাথা ও দেহ মাটিচাপা দেওয়া হয়। বিচ্ছিন্ন মাথা থেকে চুলও কেটে ফেলা হয়, যাতে সহজে লাশ কেউ চিনতে না পারে।

জবানবন্দিতে উঠে আসে, প্রতিবেশী হওয়ায় নিহত কিশোর ও পারভেজের মধ্যে পরিচয় ছিল। কিশোরটি ইয়াবা বিক্রির সঙ্গে জড়িত ছিল বলে দাবি করেন পারভেজ। তার অটোরিকশায় বিভিন্ন স্থানে ইয়াবা পরিবহন হতো বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

পারভেজের দাবি অনুযায়ী, ইয়াবা বিক্রির লাভের একটি অংশ তিনি চেয়েছিলেন, কিন্তু কিশোর তা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে হত্যার পরিকল্পনা করেন।

ঘটনার পর নিহত কিশোরের বাবা সাতকানিয়া থানায় মামলা করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে সিআইডি মামলাটির দায়িত্ব নেয় এবং সম্প্রতি পারভেজকে গ্রেপ্তার করে।

তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, ইয়াবা ব্যবসার লাভের ভাগ না পেয়ে ক্ষোভ থেকেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। মামলার সঙ্গে জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে এবং দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।

সিআইডি চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. সালাহ উদ্দিন বলেন, ক্লুলেস (সূত্রবিহীন) এই মামলার পুরো রহস্য উদ্‌ঘাটিত হয়েছে। মূলত ইয়াবা বিক্রির লাভের অংশ না পেয়ে অটোরিকশাচালক পারভেজের পরিকল্পনায় ওই কিশোরকে খুন করে লাশ গুম করা হয়েছিল। এই মামলায় শিগগিরই আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।

জানতে চাইলে মামলার বাদী ও নিহত কিশোরের বাবা বলেন, ‘নৃশংসভাবে আমার ছেলেকে মেরে লাশ গুম করে রেখেছিল আসামিরা। পারভেজের গাড়িতে করে এদিক-ওদিক যেত আমার ছেলে। আমি কল্পনাও করতে পারিনি, সেই পারভেজই আমার ছেলেকে টাকার লোভে মেরে ফেলবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ ঘটনায় জড়িত সব আসামিকে গ্রেপ্তার করা হোক। আমি সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। আর কেউ যাতে ভবিষ্যতে কারও মা-বাবার বুক খালি করতে না পারে।’

চাটগাঁ নিউজ/এসএ

Scroll to Top