শৃঙ্খলা, বৈচিত্র্য ও আধুনিকায়নের পথে বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্র

নিজস্ব প্রতিবেদক : একসময় নানা সীমাবদ্ধতা, অনুষ্ঠান বৈচিত্র্যের ঘাটতি এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্নের মুখে থাকা বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রকে আধুনিক, পূর্ণাঙ্গ ও দর্শকবান্ধব সম্প্রচার কেন্দ্রে রূপ দেওয়ার কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। গত কয়েক মাসে দৃশ্যমান হয়েছে একাধিক পরিবর্তন। কেন্দ্রটির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মো. ইমাম হোসেন দায়িত্ব নেওয়ার পর অনুষ্ঠান পরিকল্পনা, বিশেষ আয়োজন, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

রেইনবো নেশন গঠনের চলমান ধারায় পাহাড়িয়া মন, নৃ-বৈচিত্র, পাহাড়ে কৃষি, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান রংধনু সম্প্রচারিত হচ্ছে। বিশেষ করে ঈদসহ বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও আঞ্চলিক উৎসবকে কেন্দ্র করে বৈচিত্র্যময় অনুষ্ঠান নির্মাণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ঈদুল আজহায় বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের বিশেষ আয়োজন ‘পাহাড়ে ঈদ’ আলোচনায় আসে। অনুষ্ঠানে পার্বত্য চট্টগ্রামের নয়টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিল্পীরা নিজস্ব ভাষা, পোশাক, গান ও নৃত্যের মাধ্যমে অংশ নেন। অনুষ্ঠানের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন জিএম ইমাম হোসাইন।

এ আয়োজনের মাধ্যমে শুধু বিনোদন নয়, দেশের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও পার্বত্য অঞ্চলের জীবনধারাকে বৃহত্তর দর্শকের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে পাহাড়ে বসবাসকারী বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষের ঈদ উদযাপনের ধরনও তুলে ধরা হয়। ফলে প্রচলিত স্টুডিওভিত্তিক অনুষ্ঠানের বাইরে গিয়ে আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে সম্প্রচারের মূলধারায় নিয়ে আসার একটি উদ্যোগ দেখা গেছে।

নাটক ও বিনোদনধর্মী আয়োজনে বৈচিত্র্য
বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাম্প্রতিক অনুষ্ঠান পরিকল্পনায় নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিশেষ দিবসকেন্দ্রিক আয়োজন এবং বিনোদনধর্মী অনুষ্ঠানের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যমটির সঙ্গে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা কমিয়ে নতুন প্রজন্মের দর্শকদের আবার বিটিভিমুখী করার লক্ষ্য সামনে এসেছে।

সম্প্রতি নতুন পাঁচতলা ভবন উদ্বোধন, নাটক ও সংগীতানুষ্ঠান আউটডোরে ধারণের জন্য স্বতন্ত্র ইউনিট গঠন, আলাদা অডিও স্টুডিও নির্মাণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

ক্রীড়া অনুষ্ঠানেও মাঠভিত্তিক আয়োজনের উদ্যোগ দেখা গেছে। ক্রীড়া ক্ষেত্রে মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর জন্য নতুন অনুষ্ঠান ব্যাট বল হুইসেল, ক্রীড়া জগৎ ও ক্রীড়াঙ্গন সম্প্রচার চলমান। এছাড়াও ‘আউটফিল্ড’ নামের একটি ক্রিকেট অনুষ্ঠান সরাসরি মাঠ থেকে সম্প্রচারের পরিকল্পনা করা হয়, যার সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের জিএম ইমাম হোসেন। অনুষ্ঠানে জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার ও দেশি-বিদেশি ক্রিকেট বিশ্লেষকদের যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

প্রশাসনে জবাবদিহিতার ওপর জোর
কেন্দ্রটির প্রশাসনিক কার্যক্রমেও পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনে সময়ানুবর্তিতা, কাজের হিসাব এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

কেন্দ্রসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের ভাষ্য, অতীতে অনুষ্ঠান নির্মাণ ও প্রচারের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিনির্ভর তদবির এবং অনানুষ্ঠানিক প্রভাবের সুযোগ ছিল। বর্তমান ব্যবস্থাপনায় নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ায় সেই সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। বিশেষ করে অনুষ্ঠান নির্মাণের বিপরীতে শিল্পী ও কলাকুশলীদের নামে-বেনামে চেক ইস্যু এবং সম্মানী প্রদানের প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণ ও যাচাই বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে কেন্দ্রসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তাদের দাবি, এর ফলে সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বাড়ানোর পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

প্রতিটি নির্মিত ও সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী চুক্তিপত্রে সঠিক ডাকযোগাযোগ ও মোবাইল নম্বর লিখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রত্যেক অনুষ্ঠান ব্যয় বিবরণী অনলাইন ডাটায় সংরক্ষিত এবং মাসিক হিসাব সদরদপ্তরে প্রেরণ করা হয়। সম্প্রতি ইএফটিএন এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সবার ব্যাংক হিসাবে সম্মানী প্রদানের জন্য সফটওয়্যার তৈরি হয়েছে।

পূর্ণাঙ্গ টেলিভিশন স্টেশনে রূপান্তরের বড় প্রকল্প
বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের জায়গা হতে পারে অবকাঠামোগত আধুনিকায়ন। ২০২৬ সালের মার্চে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসির খান চৌধুরী কেন্দ্রটি পরিদর্শন করে চলমান উন্নয়ন কাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেন। তখন বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের জিএম মো. ইমাম হোসেন কেন্দ্রের নিয়মিত ও বিশেষ অনুষ্ঠান, চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি, জনবল সংকট এবং রাজস্ব আয় বৃদ্ধির বিভিন্ন উদ্যোগ সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রীকে অবহিত করেন। একই সময়ে জানানো হয়, ‘বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রকে পূর্ণাঙ্গ টিভি স্টেশনে রূপান্তর (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্পের ব্যয় ২৭ কোটি টাকা এবং এর প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে; বাকি কাজও দ্রুত শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী কেন্দ্রের স্টুডিও, ক্যাফেটেরিয়া, বিভিন্ন স্থাপনা ও অবকাঠামো পরিদর্শন করেন এবং আধুনিক ডিজিটাল সরঞ্জামে কেন্দ্রটিকে সমৃদ্ধ করার ওপর গুরুত্ব দেন। অর্থাৎ, বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের বর্তমান পরিবর্তন শুধু অনুষ্ঠাননির্ভর নয়; এর সঙ্গে সম্প্রচার অবকাঠামো আধুনিকায়নের একটি বড় প্রাতিষ্ঠানিক কর্মপরিকল্পনাও যুক্ত হয়েছে।

অনিয়ম বন্ধের উদ্যোগই কি বিরোধের কারণ?
কেন্দ্র সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, অনুষ্ঠান নিয়ে তদবির রোধ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের কারণে দীর্ঘদিনের সুবিধাভোগী একটি মহল ক্ষুব্ধ হয়েছে। তাদের অভিযোগ, এই মহলের একটি অংশ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর বা অসম্পূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে জিএম ইমাম হোসেনের বিরুদ্ধে নেতিবাচক জনমত তৈরির চেষ্টা করছে।

সম্প্রতি কয়েকটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে জিএম ইমাম হোসেনকে ঘিরে প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে প্রশিক্ষণ, অনুষ্ঠান নির্মাণ, শিল্পী সম্মানীসহ বিভিন্ন বিষয়ে অভিযোগ তোলা হয়। ফলে একদিকে কেন্দ্রের উন্নয়ন ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে যে ইতিবাচক তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে, অন্যদিকে জিএমের বিরুদ্ধে প্রকাশিত অভিযোগগুলোও যথাযথ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই ছাড়া চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জিএম মো. ইমাম হোসেন বলেন, বাংলাদেশ সরকার তথা জনগণের অর্থে পরিচালিত বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কর্তৃপক্ষ দুর্নীতি, অনিয়মের প্রতি জিরো টলারেন্স। এ চ্যানেলটিকে জনপ্রিয়, দর্শকমুখী করার জন্য শিল্পীসহ সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। মিথ্যা, অসত্য ও গুজব ছড়ালে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদের স্পৃহা কমে যায়। ফলে প্রকারান্তে শিল্পী সমাজ ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

তিনি আরও বলেন, ব্যক্তি স্বার্থের উর্ধ্বে ওঠে সবাইকে বিটিভি চট্টগ্রাম চ্যানেলের উন্নয়ন, সমৃদ্ধির জন্য কাজ করতে হবে। সুখের খবর, সোশ্যাল পেজে ফলোয়ার সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং অর্থ উপার্জন হচ্ছে।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ দর্শকের আস্থা ফেরানো
বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে অনুষ্ঠানমানের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। শুধু আধুনিক স্টুডিও বা প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ালেই দর্শক ধরে রাখা সম্ভব নয়; প্রয়োজন মানসম্মত নাটক, স্থানীয় সংস্কৃতি, তরুণ প্রজন্মের উপযোগী বিনোদন, ক্রীড়া, সংগীত ও সমসাময়িক বিষয়ভিত্তিক অনুষ্ঠান।

তথ্য প্রতিমন্ত্রীও মার্চে কেন্দ্র পরিদর্শনের সময় সময়োপযোগী, আকর্ষণীয় ও মানসম্মত অনুষ্ঠান প্রচারের ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে সৃজনশীল ও বিনোদনধর্মী অনুষ্ঠান পরিকল্পনা এবং রাজস্ব আয় বৃদ্ধির নির্দেশনাও দেওয়া হয়।

সব মিলিয়ে, জিএম মো. ইমাম হোসেনের দায়িত্বকালে বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রে অনুষ্ঠানের বৈচিত্র্য, বিশেষ আয়োজন, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং অবকাঠামোগত আধুনিকায়ন—এই চারটি ক্ষেত্রে পরিবর্তনের উদ্যোগ দৃশ্যমান। এখন এসব উদ্যোগ কতটা স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে রূপ নেয় এবং দর্শকের কাছে কেন্দ্রটির গ্রহণযোগ্যতা কতটা বাড়ে—সেটিই হবে এই পরিবর্তনের মূল পরীক্ষার জায়গা।

চাটগাঁ নিউজ/এসএ

Scroll to Top