জগলুল হুদা: মরুভূমির তপ্ত বালু আর প্রবাসের হাড়ভাঙা খাটুনিও যাদের আলাদা করতে পারেনি, মৃত্যুর নির্মম হাতও তাদের আলাদা করতে পারল না। প্রবাসের মাটিতে যে চার ভাই ছায়ার মতো জড়িয়ে ছিলেন একে অপরের সাথে, স্বদেশের মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার সময়ও তারা রইলেন একদম পাশাপাশি। রাশেদুল ইসলাম, শাহেদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলাম এই চার প্রবাসী ভাই দুনিয়াবি সকল কিছৃুর উর্দ্ধে গিয়ে এখন কেবলই স্মৃতি। অথচ আর কিছুদিন পরেই বিয়ের সানাই বাজার কথা ছিল পরিবারটিতে! এখন সেখানে কেবলই বেদনার করুণ সুর বেজেই চলেছে সন্তান হারা মায়ের বুকফাটা আর্তনাদে।
জানা গেছে, গত ১৩ মে (মঙ্গলবার) ওমানের মুলাদ্দা এলাকার একটি হাসপাতালের সামনে পার্কিং করা গাড়ির ভেতর এসি এক্সজস্ট থেকে নির্গত বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান এই চার প্রবাসী ভাই। গত ১৯ মে রাত সাড়ে ৮টার দিকে তাদের মরদেহ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছালে তা গ্রহণ করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী। এরপর দুটি ফ্রিজার অ্যাম্বুলেন্স যোগে আজ বুধবার (২০ মে) ভোর ৬টার দিকে মরদেহগুলো পৌঁছায় তাদের রাঙ্গুনিয়ার গ্রামের বাড়িতে।
সরেজমিনে সকাল ৭টায় বন্দারাজারপাড়ার সেই চেনা উঠানটিতে গিয়ে দেখা যায়- তিল ধারণের ঠাঁই নেই সেখানে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছেন শেষবারের মতো তাদের এক নজর দেখতে। মানুষের এই স্রোত তাদের জানাজায় জনসমূদ্রে রূপ নেয়।

প্রতিবেশিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়ে এতিম হয়েছিলেন তারা। অতি কষ্টে কুঁড়েঘরে বেড়ে ওঠা এই চার ভাই ওমান গিয়ে ভাগ্যবদল করেছিলেন। কঠোর পরিশ্রমে জায়গা কিনে তৈরি করেছিলেন একটি দ্বিতল বিশিষ্ট বাড়ি । কিন্তু নিজেদের গড়া সেই সুখের নীড়ে তারা ফিরলেন কফিনবন্দি হয়ে। উঠানে সারি বেঁধে রাখা চারটি খাটিয়া দেখে উপস্থিত আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু কিংবা দূর-দূরান্ত থেকে আসা হাজারো মানুষের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে।
মিরসরাই থেকে জানাজায় শরিক হতে ছুটে আসা সৌদি প্রবাসী নূর আলম বলেন, ‘আমি তাদের চিনি না। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে এই চার ভাইয়ের মৃত্যুর খবরটা পড়ে কলিজাটা কেঁপে উঠেছিল। একজন প্রবাসী হিসেবে এই জানাজায় শরিক না হলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারতাম না।’
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে দুইজন বিবাহিত। বাকি তিনজনের মধ্যে দুই ভাইয়ের বিয়ের যাবতীয় কেনাকাটা ও প্রস্তুতি প্রায় শেষ হয়েছিল। দেশে ফিরে ধুমধাম করে বিয়ের পিঁড়িতে বসার সব পরিকল্পনা চূড়ান্ত ছিল। কিন্তু বর্ণ ও গন্ধহীন ঘাতক গ্যাস এক নিমেষেই একটি পরিবারের সব স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দিল। বিয়ের আনন্দ মূহুর্তে বিষাদে পরিণত হয়ে গেল।
এদিকে আজ সকাল ৯টার দিকে গাউছিয়া কমিটির সহায়তায় মরদেহগুলোর গোসল সম্পন্ন করা হয়। এরপর বেলা সাড়ে ১০টার দিকে মরদেহগুলো নিয়ে যাওয়া হয় হোছনাবাদ লালানগর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। বেলা ১১টায় জানাজার মাঠ রূপ নেয় এক বিশাল জনসমুদ্রে। রাঙ্গুনিয়া ও আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা হাজার হাজার মানুষ এই চার রেমিট্যান্স যোদ্ধাকে শেষ বিদায় জানাতে উপস্থিত হন।

জানাজার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয় তখন, যখন ইমামতির জন্য সামনে এসে দাঁড়ান নিহত চার ভাইয়ের একমাত্র জীবিত ছোট ভাই মো. এনাম। যে ভাইদের স্নেহে ও হাত ধরে বড় হওয়া, তাদেরই শেষ বিদায়ের নামাজ পড়াতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তার অশ্রুসিক্ত মোনাজাতে উপস্থিত হাজারো মুসল্লির চোখ ফেটে জল নেমে আসে। জানাজা শেষে স্থানীয় মসজিদের পাশে খোঁড়া পাশাপাশি চারটি কবরে তাদের দাফন করা হয়।
জানাজায় অংশ নিয়ে প্রবাসী কল্যাণ সেন্টার চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক আতিকুর রহমান জানান, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যেকের দাফন-কাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে পরিবারটিকে আরও তিন লাখ টাকা করে অনুদান দেওয়া হবে এবং ওমান সরকার থেকে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ব্যাপারে সব ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ওমানের মরুভূমি জয় করতে যাওয়া চার ভাইয়ের এই আকস্মিক চলে যাওয়া কেবল একটি পরিবারকে ধ্বংস করেনি, পুরো রাঙ্গুনিয়াজুড়ে রেখে গেছে এক গভীর ও কখনো না শুকানো ক্ষত।
চাটগাঁ নিউজ/জেএইচ





