মিয়ানমারে সার পাচারের নতুন রুট আনোয়ারা!

আনোয়ারা প্রতিনিধি : চট্টগ্রামের আনোয়ারায় নদীপথ ব্যবহার করে ভর্তুকি মূল্যের ইউরিয়া সার মিয়ানমারে পাচারের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার হাইলধর, রায়পুর ও জুঁইদণ্ডী ইউনিয়নের কয়েকটি নদীঘাটকে পাচারের নতুন রুট হিসেবে ব্যবহার করছে সংঘবদ্ধ একটি চক্র। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে সারের দামের বড় ব্যবধান এবং দেশটিতে চলমান সংঘাতের কারণে সৃষ্ট সরবরাহ সংকটকে কাজে লাগিয়ে সমুদ্রপথে সার পাচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

একই সঙ্গে মিয়ানমার থেকে দেশে ইয়াবা আনার অভিযোগও রয়েছে চক্রটির বিরুদ্ধে। তবে স্থানীয়ভাবে আলোচিত এসব অভিযোগের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে আনোয়ারার কোনো নদীঘাট ব্যবহার করে সার পাচারের তথ্য পাওয়ার কথা নিশ্চিত করা হয়নি।

ভর্তুকির সার যাচ্ছে বিদেশে
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি তিনটি সার কারখানা। এসব কারখানায় উৎপাদিত সার এবং ডিলারদের বরাদ্দ করা সার পাচারের অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, উপজেলার নদীসংযুক্ত বিভিন্ন এলাকা ব্যবহার করে নৌপথে সার সংগ্রহ করছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। পরে উপকূলীয় পথ ধরে সেসব সার মিয়ানমারে পাঠানো হচ্ছে।

হাইলধর, রায়পুর ও জুঁইদণ্ডী ইউনিয়নের কয়েকটি নদীঘাটকে এ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, সার পাচারের সঙ্গে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ ছড়িয়েছে।

দামের ব্যবধানেই পাচারের প্রলোভন
ব্যবসা সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশে সরকারি ভর্তুকির কারণে ইউরিয়া সার তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায়। অন্যদিকে মিয়ানমারে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও চলমান সংঘাতের কারণে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় বিভিন্ন পণ্যের সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে দুই দেশের বাজারদরের ব্যবধানকে কাজে লাগিয়ে অধিক মুনাফার আশায় সার পাচারের প্রবণতা বাড়ছে বলে তাঁদের ধারণা।

সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, এক হাজার বস্তা সার মিয়ানমারে পাচার করে বিক্রি করা সম্ভব হলে চালানটির মূল্য প্রায় ৯০ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এই বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেনই সংঘবদ্ধ চক্রকে পাচারে উৎসাহিত করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মিয়ানমারে সার ছাড়াও সিমেন্টসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় ও নির্মাণসামগ্রীর সংকট রয়েছে বলে জানা গেছে। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন পণ্য অবৈধভাবে দেশটিতে নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা দেশে আনার অভিযোগ সত্য হলে তা সীমান্তপথে মাদক ও পণ্য চোরাচালানের আন্তঃসম্পর্ক নিয়েও উদ্বেগ বাড়ায়।

নদীঘাট ব্যবহারের অভিযোগ, পুলিশের বক্তব্য ভিন্ন
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জুঁইদণ্ডী ইউনিয়নের এক বাসিন্দা জানান, ইউনিয়নের তিনটি নদীঘাট ব্যবহার করে কয়েকটি সার চালান মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। এসব চালানের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

তবে আনোয়ারা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জুনায়েত চৌধুরী বলেন, আনোয়ারার কোনো নদীঘাট ব্যবহার করে মিয়ানমারে সার পাচারের তথ্য তাঁদের কাছে নেই। তারপরও সার পাচার রোধে পুলিশের নজরদারি বাড়ানো হবে বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে, আনোয়ারা উপজেলা কৃষি অফিসের দাবি, বর্তমানে উপজেলায় সারের কোনো সংকট নেই। কৃষকদের চাহিদা পূরণে উপজেলায় আটজন সার ডিলার রয়েছেন। কৃষি অফিসের চাহিদার ভিত্তিতে কারখানা থেকেও সার সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শামীম আহম্মেদ সরকার বলেন, সার পাচার রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। সমন্বিতভাবে নজরদারি করা হলে সার পাচার বন্ধ করা সম্ভব হবে।

উপকূলজুড়ে একের পর এক সার জব্দ
সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায় সার জব্দের একাধিক ঘটনায় মিয়ানমারে সার পাচারের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এসব ঘটনায় নৌপথে সার পরিবহন ও মাছ ধরার নৌযান ব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ঘাটে মিয়ানমারে পাচারের অভিযোগে ৬০০ বস্তা বা ৩০ টন ইউরিয়া সার জব্দ করে কোস্ট গার্ড। জব্দ করা সারের আনুমানিক বাজারমূল্য ছিল ২১ লাখ টাকা।

এর পরদিন ২৫ সেপ্টেম্বর মিরসরাইয়ের ইছাখালী ঘাট এলাকায় চারটি ট্রাক থেকে মাছ ধরার নৌযানে সার তোলার সময় ৯৬০ বস্তা ইউরিয়া জব্দ করা হয়। ৫০ কেজি ওজনের এসব বস্তায় মোট ৪৮ টন সার ছিল। জব্দ করা সারের আনুমানিক মূল্য ৩৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হয়।

এর আগে সেপ্টেম্বরের শুরুতে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী এলাকায় ৪১০ বস্তা ইউরিয়া সার এবং হালিশহরের দাবিরখাল এলাকায় ১১ টন সার মিয়ানমারে পাচারের চেষ্টার সময় জব্দ করা হয়। এ ছাড়া ১০ সেপ্টেম্বর বাঁশবাড়িয়া ঘাটে আরও ৩৫ টন ইউরিয়া সার জব্দ করে কোস্ট গার্ড। ওই ঘটনায় দুজনকে আটক করা হয়।

এসব অভিযানে জব্দ করা সারের মধ্যে আনোয়ারায় অবস্থিত কাফকো সার কারখানায় উৎপাদিত সারও দেখা গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সার কীভাবে উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছাচ্ছে এবং সরবরাহব্যবস্থার কোন পর্যায়ে অনিয়ম ঘটছে, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।

‘অপারেশন সার সুরক্ষা’ নিয়ে মাঠে কোস্ট গার্ড
কোস্ট গার্ড পূর্ব জোনের জোনাল অফিসার ক্যাপ্টেন মো. মিনহাজুল আলম জানান, সার পাচার রোধে কোস্ট গার্ড সদর দপ্তরের নির্দেশনায় ‘অপারেশন সার সুরক্ষা’ চালু করা হয়েছে। এ কার্যক্রমের আওতায় অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি সমুদ্রপথেও নজরদারি চালানো হচ্ছে।

তিনি জানান, সন্দ্বীপ, মিরসরাই, ভাটিয়ারী, কুতুবদিয়া, সেন্টমার্টিন ও কক্সবাজারের কয়েকটি এলাকায় সার সংগ্রহ ও পাচারের সঙ্গে একটি চক্রের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।

কোস্ট গার্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পূর্ব জোনের চোরাচালানবিরোধী অভিযানে ২ লাখ ৫৫ হাজার ৭০০ কেজি সার জব্দ করা হয়েছে। এ সময় আটক করা হয়েছে ৯৫ জন চোরাকারবারিকে। তাঁদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট থানায় ১৫টি মামলা করা হয়েছে।

কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, জব্দ করা সার ও অন্যান্য আলামতের বিষয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পরে জব্দ করা সার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

কৃষি ও অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
সরকারি ভর্তুকিতে কৃষকদের জন্য সরবরাহ করা সার পাচার হলে একদিকে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হয়, অন্যদিকে কৃষকের জন্য নির্ধারিত সারের সরবরাহব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে সংকট তৈরি হলে কৃষকদের বাড়তি দামে সার কিনতে হতে পারে, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। যদিও আনোয়ারা উপজেলা কৃষি অফিস বর্তমানে সারের সংকট নেই বলে জানিয়েছে, তবু পাচারের অভিযোগের প্রকৃত অবস্থা যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে কারখানা থেকে সার সরবরাহ, ডিলারদের বরাদ্দ ও বিক্রির হিসাব, পরিবহনপথ এবং নদীঘাটে পণ্য ওঠানামার ওপর কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে আনোয়ারার নদীঘাটকে সার পাচারের নতুন রুট হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ তদন্ত করে দেখা, জব্দ করা সারের উৎস শনাক্ত করা এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়াই এখন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সার পাচারের সঙ্গে মাদক চোরাচালানের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে তা শুধু কৃষি খাত নয়, রাষ্ট্রীয় সম্পদ সুরক্ষা ও উপকূলীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

চাটগাঁ নিউজ/সাজ্জাদ/এসএ

Scroll to Top