নিজস্ব প্রতিবেদক : চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারীতে অবস্থিত ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তাব্যবস্থা, তদারকি এবং আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দুর্ঘটনার মাত্র এক মাস আগে পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা করেছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই)। এরপরও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না হওয়ায় ভয়াবহ এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে ফেরদৌস স্টিলের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে নোঙর করা একটি পুরোনো এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজে স্ক্র্যাপ কাটার সময় হঠাৎ বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাস্থলেই কয়েকজন শ্রমিক অচেতন হয়ে পড়েন। পরে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে একে একে নয়জনের মৃত্যু হয়। আহত ও অসুস্থ আরও কয়েকজন শ্রমিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে।
নিরাপত্তা ত্রুটির অভিযোগে আগেই মামলা
ডিআইএফই সূত্র জানায়, নিয়মিত পরিদর্শনের অংশ হিসেবে গত ২ ফেব্রুয়ারি ফেরদৌস স্টিল শিপইয়ার্ড পরিদর্শন করেন সংস্থার কর্মকর্তারা। পরিদর্শনে শ্রমিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, ঝুঁকিপূর্ণ কাজে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং আইন অনুযায়ী বিভিন্ন নিরাপত্তা মানদণ্ডে একাধিক ত্রুটি ধরা পড়ে।
এসব অনিয়মের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে লিখিত নোটিশ দেওয়া হয় এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে একাধিকবার তাগাদা দেওয়া হলেও কর্তৃপক্ষ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেনি। ফলে গত ১৫ জুলাই চট্টগ্রাম শ্রম আদালতে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন ডিআইএফইর পরিদর্শক মো. সাহেদ পারভেজ তালুকদার।
চট্টগ্রাম কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান বলেন, ‘পরিদর্শনে একাধিক নিরাপত্তা ব্যত্যয় ধরা পড়েছিল। নোটিশ দেওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানটি তা বাস্তবায়ন করেনি। তাই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’
কীভাবে ঘটল দুর্ঘটনা
ডিআইএফইর প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাহাজটির অভ্যন্তরে স্ক্র্যাপ কাটার কাজ চলাকালে হঠাৎ গ্যাস লিকেজ হয়ে কার্বন মনোক্সাইড ছড়িয়ে পড়ে। এতে জাহাজের ভেতরে অক্সিজেনের মাত্রা দ্রুত কমে যায়। শ্রমিকরা শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে অচেতন হয়ে পড়েন। পর্যাপ্ত উদ্ধার সরঞ্জাম ও জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা না থাকায় প্রাণহানির সংখ্যা বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্বন মনোক্সাইড একটি বর্ণহীন, গন্ধহীন এবং অত্যন্ত বিষাক্ত গ্যাস। এটি রক্তের হিমোগ্লোবিনের সঙ্গে দ্রুত যুক্ত হয়ে শরীরে অক্সিজেন পরিবহনে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষ অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে এবং দ্রুত উদ্ধার না হলে মৃত্যু ঘটতে পারে।
অনুমোদন নিয়েও প্রশ্ন
দুর্ঘটনার পর জাহাজটি কাটার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমান বলেন, ফেরদৌস স্টিলের কোন জাহাজের পরিবেশগত অনুমোদন রয়েছে আর কোনটির নেই, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। দুর্ঘটনার পর পুরো এলাকা ঘিরে রাখায় পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে প্রবেশ করতে পারেননি। তদন্ত শেষে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
তিনি আরও বলেন, কেবল পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন থাকলেই জাহাজ কাটা যায় না। বিস্ফোরক অধিদপ্তর, বন্দর কর্তৃপক্ষ, কাস্টমস, শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রয়োজনীয় অনুমতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক।
নিরাপদ জাহাজ কাটার নিয়ম কী
শিপ রিসাইক্লিং নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো জাহাজ কাটার আগে জাহাজের ট্যাংক, পাইপলাইন এবং বদ্ধ স্থানগুলোতে দাহ্য বা বিষাক্ত গ্যাস রয়েছে কি না, তা বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে পরীক্ষা করতে হয়। গ্যাসমুক্ত (Gas Free Certificate) সনদ ছাড়া ঝালাই বা কাটিংয়ের কাজ শুরু করার সুযোগ নেই।
এ ছাড়া জাহাজে থাকা তেল, গ্যাস, স্লাজ, বিলজ ওয়াটার, রাসায়নিক পদার্থ, অ্যাসবেস্টসসহ বিভিন্ন বিপজ্জনক উপাদান অপসারণ এবং শ্রমিকদের জন্য গ্যাস মাস্ক, অক্সিজেন সরঞ্জাম, সেফটি হারনেস ও জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা নিশ্চিত করারও বিধান রয়েছে।
তদন্তে গিয়ে হামলার শিকার শ্রম পরিদর্শক
দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গেলে ডিআইএফইর একটি প্রতিনিধি দলের ওপর স্থানীয় উত্তেজিত লোকজন হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেছে সংস্থাটি। এতে দুইজন শ্রম পরিদর্শক গুরুতর আহত হন। এ ঘটনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
অতীতেও বহু দুর্ঘটনা
বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পে নিরাপত্তাহীনতার কারণে প্রায়ই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। শ্রমিক সংগঠন ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে বিস্ফোরণ, অগ্নিকাণ্ড, ভারী লোহার পাত চাপা পড়া এবং বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে বহু শ্রমিক নিহত ও আহত হয়েছেন। যদিও বিভিন্ন সময় নিরাপত্তা জোরদারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, বাস্তবায়নের ঘাটতির অভিযোগ রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপত্তা বিধিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, নিয়মিত পরিদর্শন, আইন লঙ্ঘনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত না করলে এ ধরনের দুর্ঘটনা বন্ধ করা সম্ভব হবে না।
তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি
দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতা, জাহাজটির প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্টদের দায় নির্ধারণে একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ এবং আহতদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
এদিকে ভয়াবহ এ দুর্ঘটনা দেশের শিপ রিসাইক্লিং শিল্পে নিরাপত্তা সংস্কৃতি এবং তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে আবারও বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
চাটগাঁ নিউজ/এসএ





