বালু লুটে বিপন্ন কক্সবাজার সৈকত— ১৮ বছরে প্রাণ গেল ১৩১ পর্যটকের

নিজস্ব প্রতিবেদক : দিনের আলোয় পর্যটকদের পদচারণায় মুখর কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত। সূর্য ডোবার পর সেই সৈকতেরই কোনো কোনো অংশ হয়ে ওঠে বালু লুটের গোপন ক্ষেত্র। রাতের আঁধারে ড্রেজার, বিশেষ মেশিন ও পাইপলাইন বসিয়ে সৈকতের তলদেশ ও বালিয়াড়ি থেকে অবৈধভাবে বালু তুলে নেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এর ফলে সৈকতের বিভিন্ন স্থানে তৈরি হচ্ছে গভীর গর্ত, বদলে যাচ্ছে বালুর স্বাভাবিক গঠন। কোথাও কোথাও এসব গর্ত ও স্রোতধারা পরিণত হচ্ছে গুপ্তখাল বা চোরাবালির মতো বিপজ্জনক স্থানে।

পরিবেশবাদীদের হিসাবে, গত ১৮ বছরে সৈকতের এমন গুপ্তখাল ও চোরাবালিতে পড়ে অন্তত ১৩১ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৬ আগস্টও সুগন্ধা ও লাবণী পয়েন্টের মাঝামাঝি এলাকায় গোসলে নেমে ইয়াসিন খান (২৫) নামে এক পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। তাঁর চাচাতো ভাই ইব্রাহিম খান (২৭) এখনো নিখোঁজ ছিলেন বলে ওই দিনের প্রতিবেদনে জানানো হয়। লাইফগার্ডদের ধারণা, তাঁরা রিপ কারেন্ট বা গুপ্তখালে পড়ে গিয়েছিলেন।

রাতের আঁধারে বালু উত্তোলন
সৈকত থেকে বালু লুটের সর্বশেষ দৃশ্য ধরা পড়ে ৭ আগস্ট রাতে। কলাতলী পয়েন্টের ভাঙ্গার মোড়সংলগ্ন এলাকায় পাইপলাইন ও বিশেষ মেশিন বসিয়ে বালু তোলা হচ্ছিল। খবর পেয়ে রাত ১টার দিকে জেলা প্রশাসনের পর্যটন শাখার একটি দল সেখানে অভিযান চালায়। তবে প্রশাসনের উপস্থিতি টের পেয়ে জড়িতরা পালিয়ে যায়।

পরে ঘটনাস্থল থেকে বালু উত্তোলনের মেশিন, বড় আকৃতির পাইপ ও বিপুলসংখ্যক জিওব্যাগ জব্দ করা হয়। প্রশাসন জানিয়েছে, সৈকতের বালিয়াড়ির কাছাকাছি একটি ভবন থেকে পাইপলাইন বসিয়ে বালু নেওয়া হচ্ছিল। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

পর্যটন শাখার ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান সায়েম বলেন, জব্দ করা আলামতের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ঘটনাস্থলে তিনজন বিচকর্মীকেও মোতায়েন করা হয়েছে।

বালু চুরি, নাকি ঝুঁকি তৈরির কারখানা?
সৈকত থেকে বালু উত্তোলনের বিষয়টি শুধু পরিবেশগত ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পর্যটকদের নিরাপত্তায়। বালু সরে গেলে সমুদ্রের তলদেশে গভীর গর্ত তৈরি হতে পারে। জোয়ার-ভাটার স্রোত সেই গর্তের আকৃতি ও অবস্থান বদলে দিলে সৃষ্টি হয় আকস্মিক স্রোত বা রিপ কারেন্ট। পর্যটকেরা পানিতে নামার পর এসব গর্ত বা স্রোতের অবস্থান বুঝতে না পেরে মুহূর্তেই বিপদে পড়েন।

গত ২৬ আগস্টের ঘটনাটিও সেই ঝুঁকির নতুন উদাহরণ। সুগন্ধা ও লাবণী পয়েন্টের মাঝামাঝি এলাকায় গোসলে নেমে ইয়াসিন খান স্রোতে ভেসে যান। পরে তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর চাচাতো ভাই ইব্রাহিম খান নিখোঁজ হন। উদ্ধার অভিযানে ট্যুরিস্ট পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও লাইফগার্ড সদস্যরা অংশ নেন।

এর আগে আগস্টের শুরুতেও সৈকতে পর্যটক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ১ আগস্ট দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে শৌভিক রায় নামে এক পর্যটক সমুদ্রে পড়ে মারা যান। যদিও ঘটনাটি বালু উত্তোলনজনিত দুর্ঘটনা নয়, তবু সৈকতে পর্যটকদের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে।

জিওটিউব বাঁধেও বিতর্ক
সৈকতের ভাঙন ঠেকাতে ২০২০ সাল থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জিওটিউব বাঁধ নির্মাণ করছে। এতে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও সৈকতের ভাঙন পুরোপুরি থামানো যায়নি। বরং কোনো কোনো এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা বাড়ার অভিযোগ রয়েছে।

পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, সৈকতের কাছ থেকেই বালু তুলে জিওটিউব বাঁধে ব্যবহার করা হলে একদিকে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা হচ্ছে, অন্যদিকে একই প্রক্রিয়ায় সৈকতের তলদেশে গর্ত তৈরি করা হচ্ছে। পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’—ধরা’র কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরীর দাবি, গত ১৮ বছরে গুপ্তখাল ও চোরাবালিতে পড়ে অন্তত ১৩১ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, অবৈধ বালু উত্তোলন ও জিওব্যাগের বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম—দুই কারণেই সৈকতের বিভিন্ন এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ স্থান তৈরি হয়েছে।

সৈকত রক্ষায় জিওব্যাগের বাঁধ তৈরির ক্ষেত্রে বাইরে থেকে বালু আনার কথা থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, কোথাও কোথাও বাঁধের মাত্র ১০ থেকে ১৫ ফুট দূর থেকেই মেশিন দিয়ে বালু তুলে তা ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে যে বালু দিয়ে সৈকত রক্ষার ব্যবস্থা করার কথা, সেই বালু সরিয়েই আবার নতুন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ পরিবেশবাদীদের।

ভাঙনও থামছে না
সৈকত রক্ষায় জিওটিউব ব্যবহারের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অতীতের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, জোয়ারের ধাক্কায় জিওটিউবের অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সৈকতের বিভিন্ন অংশে ভাঙন অব্যাহত থেকেছে। ২০২২ সালের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, জোয়ারের তাণ্ডবে কয়েক কিলোমিটার সৈকত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি নির্মাণাধীন জিওটিউব বাঁধের অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

ফলে একদিকে সৈকতের প্রাকৃতিক বালু সরে যাচ্ছে, অন্যদিকে কৃত্রিম বাঁধ দিয়ে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চলছে। এই দুই প্রক্রিয়ার মধ্যে সমন্বয়, পরিবেশগত প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

১৮ বছরে ১৩১ মৃত্যু, তবু স্থায়ী সমাধান নেই
পরিবেশবাদীদের দেওয়া ১৩১ মৃত্যুর হিসাব কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এর পেছনে রয়েছে পর্যটকদের নিরাপত্তাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতার চিত্র। ২০২৫ সালের বিভিন্ন প্রতিবেদনে সৈকতের গুপ্তখালে পর্যটক মৃত্যুর পাশাপাশি একাধিক পর্যটককে জীবিত উদ্ধারের ঘটনাও উঠে এসেছে। এক পর্যায়ে লাবণী, সুগন্ধা, সিগাল ও কলাতলী পয়েন্টে কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গুপ্তখাল তৈরি হওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।

ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় লাল নিশানা টাঙানো, মাইকিং ও লাইফগার্ডের সতর্কতা থাকলেও পর্যটকদের একটি অংশ তা উপেক্ষা করে পানিতে নামেন। ফলে শুধু পর্যটকের অসচেতনতা দিয়ে মৃত্যুর দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। কারণ, বিপজ্জনক স্থানগুলো চিহ্নিত, স্থায়ীভাবে ঘেরাও এবং পর্যটকদের জন্য দৃশ্যমানভাবে নিষিদ্ধ করা কতটা কার্যকর—সেটিও প্রশ্নের বিষয়।

প্রশাসনের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেছেন, সমুদ্র থেকে বালু উত্তোলন অত্যন্ত ভয়াবহ বিষয়। এতে সৈকতের স্বাভাবিক গঠন ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মৃত্যুফাঁদ তৈরি হতে পারে। অভিযোগ তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

কিন্তু বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে এই চক্র থামানো যাবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। ৭ আগস্ট অভিযান চালানোর পরও ২৬ আগস্ট সৈকতের বিপজ্জনক স্রোতে পর্যটকের মৃত্যু প্রমাণ করছে, ঝুঁকির বিষয়টি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সৈকত থেকে বালু উত্তোলন বন্ধে রাতের বেলায় নিয়মিত নজরদারি, ড্রেজার ও পাইপলাইন ব্যবহারের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকিপূর্ণ গর্ত ও রিপ কারেন্টের বৈজ্ঞানিক ম্যাপিং এবং জিওটিউব নির্মাণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে গুপ্তখাল ও চোরাবালি চিহ্নিত করে সেগুলো ঘিরে দিতে হবে এবং পর্যটকদের জন্য স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিতে হবে।

কারণ, কক্সবাজারের সৈকত শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়—এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। রাতের আঁধারে সেই সৈকতের বালু চুরি হয়ে যদি দিনে তা পর্যটকের মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়, তবে অভিযান নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত প্রতিরোধব্যবস্থা।

চাটগাঁ নিউজ/এসএ

Scroll to Top