নিজস্ব প্রতিবেদক : পাহাড়ধসের ঝুঁকি কমাতে প্রতি বছরই নানা কাগুজে উদ্যোগ ও লোকদেখানো সতর্কবার্তা দেওয়া হলেও চট্টগ্রামে থামছে না প্রাণহানির মিছিল। বিগত ১৭ বছরে এখানে পাহাড়ধসে আড়াই শতাধিক মানুষের মৃত্যু হলেও স্থায়ী সমাধানের কোনো উদ্যোগ নেই। সর্বশেষ গত ৮ জুলাই চট্টগ্রামের পৃথক দুটি স্থানে পাহাড়ধসে মাটিচাপা পড়ে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু পাহাড় কাটার অরাজকতা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে আরও একবার জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে।
১৭ বছরে মৃত্যু ২৪৮ জনের: ভয়াবহ পরিসংখ্যান
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৭ বছরে চট্টগ্রাম মহানগর ও আশপাশের এলাকায় পাহাড়ধসে মোট ২৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০০৭ সালের ১১ জুন চট্টগ্রামের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ পাহাড়ধসে ১২৭ জনের প্রাণহানি ঘটে।
এরপর ২০০৮ সালে ১২ জন, ২০০৯ ও ২০১০ সালে ১৫ জন, ২০১১ সালে ১৭ জন, ২০১২ সালে ২৪ জন, ২০১৩ সালে ২ জন, ২০১৫ সালে ৫ জন, ২০১৭ সালে ৩০ জন, ২০১৮ সালে ৪ জন, ২০২২ সালে ৪ জন এবং ২০২৩ সালে ২ জন পাহাড়ধসে মারা যান। সর্বশেষ গত ৮ জুলাই টানা ভারী বৃষ্টির মধ্যে চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ থানার চশমা হিল এলাকায় পাহাড়ধসে মাটিচাপা পড়ে ১২ বছর বয়সী সুমাইয়া আক্তার নামের এক শিশু মারা যায়। একই দিনে সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় পাহাড়ের পাদদেশে নির্মিত বসতঘরের ওপর পাহাড় ধসে পড়লে ১০ মাস বয়সী শিশু আশরাফুল ইসলাম তানভীর প্রাণ হারায়।
কেন থামছে না মৃত্যু?– কী বলছেন সংশ্লিষ্টরা
চশমা হিল এলাকার দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি পরিদর্শনে এসে দেখলাম, এখানে অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে পাহাড় কাটা হয়েছে। পাহাড়টি প্রাকৃতিকভাবে ঢালু থাকার কথা থাকলেও লোভী চক্র সেটি কেটে প্রায় খাড়া করে ফেলেছে। ফলে পুরো এলাকাটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অতীতে পাহাড় কাটার যে অরাজকতা চলেছে, তা বন্ধে আমরা এখন কঠোর অবস্থানে রয়েছি। শুধু আইন করলেই হবে না, পাহাড় কাটার সাথে জড়িত অবৈধ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।’
‘প্রশাসন শুধু দুর্ঘটনার পর সক্রিয় হয়’ – পরিবেশ বিশেষজ্ঞ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন প্রশাসনের কেবল দুর্যোগকালীন তৎপরতাকে দায়ী করেছেন। তাঁর মতে, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো শুধু বর্ষা এলে এবং দুর্ঘটনা ঘটার পর সক্রিয় হয়। মাইকিং করে দায়িত্ব শেষ করাটাই তাদের রেওয়াজ।
তিনি বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলা বা পাহাড় রক্ষা শুধু বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর সতর্কবার্তা প্রচারে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। স্থায়ীভাবে পাহাড় রক্ষা করতে হলে পাহাড় কাটা বন্ধ করা, ইঞ্জিনিয়ারিং সমীক্ষার মাধ্যমে পাহাড়ের মাটির ধরন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে আগেভাগে স্থায়ী পুনর্বাসন করা জরুরি।
‘বিকল্প আবাসন নেই, যাব কোথায়?’– বিপন্ন বাসিন্দা
ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসরত ছিন্নমূল মানুষের বাধ্যবাধকতার কথা উঠে এসেছে স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্যে। জঙ্গল সলিমপুর ও আকবরশাহ এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তারা কয়েক যুগ ধরে সেখানে বসবাস করছেন। বিকল্প বাসস্থানের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় তারা জেনেশুনেই মৃত্যুর মুখে বাস করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ ইসহাক ও মোহাম্মদ তৈয়ব আক্ষেপ করে বলেন, প্রতিবছর বর্ষা এলেই আমরা আতঙ্কে রাত জাগি। পাহাড়ের ফাটল দেখলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসি। কিন্তু আমরা গরিব মানুষ, আমাদের তো যাওয়ার জায়গা নেই। সরকার যদি আমাদের কোনো গুচ্ছগ্রাম বা নিরাপদ জায়গায় স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করত, তবে আমরা আজই এই মরণকূপ ছেড়ে চলে যেতাম।
‘স্থায়ী সমাধানের চেষ্টা চলছে’ – স্থানীয় প্রশাসন
দুর্যোগ ও উদ্ধার তৎপরতা নিয়ে সীতাকুণ্ড উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দিন বলেন, ‘ভারী বর্ষণ শুরু হলেই ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে ও আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নিতে আমাদের টিম সার্বক্ষণিক কাজ করে। তবে শুধু সরিয়ে নেওয়াই শেষ কথা নয়, পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত এই পরিবারগুলোর জীবনের ঝুঁকি এড়াতে স্থায়ী সমাধানের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।’
মূল সংকট: রাজনৈতিক আশীর্বাদ ও পুনর্বাসনের অভাব
পরিবেশবাদী ও নাগরিক সমাজ মনে করে, চট্টগ্রামে একসময় ২০০টিরও বেশি পাহাড় থাকলেও পাহাড়খেকোদের অত্যাচারে বর্তমানে তা এক-তৃতাংশের নিচে নেমে এসেছে। মাঝেমধ্যে সাধারণ কিছু দিনমজুর শ্রমিককে গ্রেফতার করা হলেও পাহাড় কাটার নেপথ্যের মূল কুশীলব ও প্রভাবশালী চক্র রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক আশীর্বাদে বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
সচেতনমহলের দাবি, চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের এই মৃত্যুর মিছিল থামাতে হলে পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে হবে। শুধু বর্ষা এলে মাইকিং করা কিংবা উচ্ছেদ নাটক না করে, পাহাড়ে গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে এবং ঝুঁকিতে থাকা শ্রমজীবী মানুষদের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায়, প্রতি বর্ষায় এমন লাশের মিছিল আরও দীর্ঘ হতেই থাকবে।
চাটগাঁ নিউজ/এসএ





