পরিকল্পিত চট্টগ্রাম গড়তে নগর সরকারের বিকল্প নেই: চসিক প্রশাসক

চাটগাঁ নিউজ ডেস্ক : চট্টগ্রামকে নান্দনিক, পরিচ্ছন্ন, সবুজ, স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ ও স্মার্ট নগর হিসেবে গড়ে তুলতে নগর সরকার প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন।

তিনি বলেন, নগরের উন্নয়নে সম্পৃক্ত বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক সম্ভাবনাময় প্রকল্প বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পরিকল্পনা, অবকাঠামো, ভূমি ব্যবস্থাপনা, পরিবহন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও নাগরিক সেবা একই কাঠামোর আওতায় পরিচালনা করতে নগর সরকার প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) চট্টগ্রামের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার হলে কমনওয়েলথ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ চ্যাপ্টার আয়োজিত ‘চট্টগ্রাম: ইকোনমিক গেটওয়ে অ্যান্ড লাইফলাইন অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।

সংগঠনের সভাপতি পারভিন এফ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আমীরুল হক। আলোচনায় অংশ নেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, শিল্পকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের বিপুল সম্ভাবনা এ নগরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। কিন্তু বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, চসিক, সিডিএ, চট্টগ্রাম ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনসহ নগরের উন্নয়ন এবং নাগরিক সেবার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিত প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আইনগত দায়িত্ব বজায় রেখেই সমন্বিত পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব।

প্রশাসক বলেন, নগরের সড়ক নির্মাণ, পানি নিষ্কাশন, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাতে। এভাবে বিচ্ছিন্ন পরিকল্পনায় আধুনিক নগর গড়ে তোলা সম্ভব নয়। উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে সমন্বয় থাকতে হবে।

জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএ ও সিটি করপোরেশন বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। খাল খনন, নালা সংস্কার, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে। তবে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানের জন্য খাল, নালা, ড্রেন, জলাধার ও পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক পথগুলো সমন্বিতভাবে ব্যবস্থাপনা করতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং দায়িত্বের সুনির্দিষ্ট বণ্টনও নিশ্চিত করতে হবে।

কর্ণফুলী নদীর অপর পারে পরিবেশবান্ধব নগর ও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রশাসক বলেন, গত প্রায় দেড় বছর ধরে সেখানে সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক শিল্প ও পরিবেশবান্ধব নগর গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ ধারণায় পরিকল্পিত উন্নয়নের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। নগর সরকার থাকলে এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও সমন্বিত ও কার্যকর হতো।

চসিক প্রশাসক আরও বলেন, নগরের উন্নয়নে শুধু অর্থ বরাদ্দ যথেষ্ট নয়; সময়মতো প্রকল্প অনুমোদন ও কার্যকর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও জরুরি। কোথায় সড়ক হবে, কোথায় শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে, কোথায় হকার পুনর্বাসন করা হবে কিংবা কোথায় নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে- এসব বিষয়ে সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থা প্রয়োজন।

চট্টগ্রামকে দেশের প্রকৃত বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রশাসক বলেন, বন্দরকেন্দ্রিক শিল্পায়ন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাবান্ধব অবকাঠামো সমন্বিতভাবে উন্নত করতে হবে।

তিনি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের মতো অবকাঠামো প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চট্টগ্রামের অবস্থান শক্তিশালী করার পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হয়। ২০০৪ সালেও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পরিকল্পনাগুলো প্রত্যাশিত গতিতে বাস্তবায়িত হয়নি।

তিনি বলেন, চট্টগ্রামের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা ও নগর সরকারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কাছেও তুলে ধরেছি। নগরের নাগরিক সেবা, অবকাঠামো, বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনা একটি সমন্বিত পরিকল্পনার অধীনে পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন।

সেমিনারে বক্তারা চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দেশের প্রধান শহরগুলোর মধ্যে উন্নত ও দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন। ঢাকা-চট্টগ্রাম যাতায়াতের সময় প্রায় দুই ঘণ্টায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যে আধুনিক পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়ন, গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও সেবাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম রাজধানীর বাইরে সম্প্রসারণ এবং শিল্প-বাণিজ্যবান্ধব পরিকল্পিত নগরায়ণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

বক্তারা বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে চট্টগ্রামের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করতে অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, দ্রুত পণ্য পরিবহন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।

চাটগাঁ নিউজ/এসএ

Scroll to Top