জগলুল হুদা: ধান চাষে উৎপাদন খরচের তুলনায় কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় বিকল্প হিসেবে লাভজনক আখ চাষের দিকে ঝুঁকছেন চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার কৃষকেরা। চলতি মৌসুমে বৈরী আবহাওয়া ও কালবৈশাখী ঝড়ে কিছু খেত ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ভালো ফলন এবং বাজারে তুলনামূলক বেশি দাম পাওয়ায় সন্তুষ্ট তাঁরা। বিশেষ করে বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএসআরআই) উদ্ভাবিত উন্নত জাতের আখ চাষ করে অনেকে ভালো লাভের মুখ দেখছেন।
উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রাঙ্গুনিয়ায় ৩৮ হেক্টর জমিতে আখ চাষ হয়েছে। এর মধ্যে বিএসআরআই-৪২ জাতের আবাদ হয়েছে ৮ হেক্টরে। গত মৌসুমে এ জাতের আবাদ ছিল ৯ হেক্টর। বিএসআরআই-৪৭ জাতের আবাদ হয়েছে ২১ হেক্টরে, যা গত মৌসুমে ছিল ২২ হেক্টর। এ ছাড়া ঈশ্বরদী-৩৯ জাত ৪ হেক্টর এবং জনপ্রিয় ব্ল্যাক রুবি জাত ৫ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে।
উপজেলার ইসলামপুর, পোমরা ও পদুয়া এলাকায় এবার আখের আবাদ তুলনামূলক বেশি হয়েছে। গত বছরের চেয়ে মোট আবাদি জমি সামান্য কমলেও আধুনিক পদ্ধতিতে পরিচর্যা ও উৎপাদনের কারণে ফলনে তেমন নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মাঠের পর মাঠজুড়ে সবুজ আখের খেত। কৃষকেরা জানান, ভাদ্র মাসে চারা রোপণের পর প্রায় এক বছর ধরে আখের পরিচর্যা করতে হয়। পরবর্তী ভাদ্র মাসে এসে তা কাটার উপযোগী হয়। সময় ও শ্রমের প্রয়োজন হলেও ধানের তুলনায় আখে লাভের সম্ভাবনা বেশি হওয়ায় তাঁরা এ ফসল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার ঘাটচেক এলাকার কৃষক মোহাম্মদ ফরিদ ১০ গণ্ডা জমিতে আখ চাষ করেছেন। কালবৈশাখী ঝড়ে তাঁর খেতের কিছুটা ক্ষতি হলেও ইতোমধ্যে লক্ষাধিক টাকার আখ বিক্রি করেছেন। খেতে থাকা আখ থেকে আরও প্রায় ১ লাখ ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা বিক্রির আশা করছেন তিনি।
একই এলাকার কৃষক মোহাম্মদ ইসলাম এবার ৬ গণ্ডা জমিতে আখ চাষ করেছেন। গত বছর আধা কানি জমিতে আবাদ করলেও এবার খাজনার জমি না পাওয়ায় আবাদ কমাতে হয়েছে তাঁকে। তবে আখসহ বিভিন্ন ফসল মিলিয়ে তাঁর প্রায় ৫ কানি জমিতে চাষাবাদ চলছে। আখ বিক্রি করে প্রায় অর্ধলক্ষাধিক টাকা আয় হবে বলে আশা করছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, পাইকারেরা খেত থেকেই আখ কিনে নিয়ে যাওয়ায় বাজারজাতকরণ নিয়ে বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হয় না।
পড়াশোনার পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই আখ চাষ করছেন রাঙ্গুনিয়া কলেজের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আরিফ। এবার তিনি এক কানি জমিতে আখ চাষ করেছেন। কালবৈশাখীর ঝড়ে তাঁর পুরো খেতের আখ মাটিতে পড়ে যায়। পরে শ্রমিক দিয়ে অতিরিক্ত পরিচর্যা করে গাছগুলো আবার দাঁড় করাতে হয়েছে। এতে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ লাখ টাকা। তবে সবকিছু ঠিক থাকলে খেত থেকে ৫ লাখ টাকার বেশি আখ বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা তাঁর।
কৃষকেরা জানান, কালবৈশাখী ঝড়ে গাছ পড়ে যাওয়ায় এবার বাড়তি শ্রমিক ও পরিচর্যা খরচ হয়েছে। বর্তমানে আকারভেদে খেত থেকে প্রতিটি আখ ৫০ থেকে ৬০ টাকা দরে কিনছেন পাইকারেরা। পরে সেগুলো খুচরা বাজারে ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। আকারে বড় ও ভালো মানের কোনো কোনো আখের দাম ১৫০ টাকা পর্যন্ত উঠছে।
রোয়াজারহাটের ব্যবসায়ী মো. শওকত বলেন, গরমের সময় আখের চাহিদা বেড়ে যায়। তাঁরা নিজেদের খেতে উৎপাদিত আখের পাশাপাশি রাঙ্গুনিয়ার বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের খেত থেকেও সরাসরি আখ কিনে বাজারে বিক্রি করছেন।
তবে লাভজনক ফসল হলেও আখ চাষে সরকারি প্রণোদনা না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে কৃষকদের। তাঁদের দাবি, সার, বীজ ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলে এ অঞ্চলে আখ চাষ আরও সম্প্রসারিত করা সম্ভব। এতে ধানের বিকল্প হিসেবে কৃষকদের জন্য আখ আরও লাভজনক ফসলে পরিণত হবে।
উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা প্রণব চন্দ্র মজুমদার বলেন, কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। সঠিক পরিচর্যার পাশাপাশি আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে রাঙ্গুনিয়ায় আখ চাষ কৃষকদের আর্থিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
চাটগাঁ নিউজ/এমকেএন





