চলতি মৌসুমেই নগরীকে ৭০-৮০ ভাগ জলাবদ্ধতামুক্ত করব: মেয়র

চাটগাঁ নিউজ ডেস্ক: চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, চলতি মৌসুমেই নগরীকে ৭০-৮০ ভাগ জলাবদ্ধতামুক্ত করার লক্ষ্যে কাজ করছে সেবা সংস্থাগুলো।

আজ বুধবার টাইগারপাসস্থ চসিক কার্যালয়ে চট্টগ্রাম মহানগরীর সকল খাল ও পানি নিষ্কাশন নালা সারা বছর সচল রাখা, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং বিভিন্ন উন্নয়ন ও সেবামূলক কাজের সমন্বয় জোরদারে গঠিত ১৯ সদস্যবিশিষ্ট সমন্বয় কমিটির প্রথম সভায় এ তথ্য জানান মেয়র।

সভায় মেয়র বলেন, আমি মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে বর্ষায় বহদ্দাররহাট, মুরাদপুর, চকবাজার, মির্জাপুল, বাকলিয়া, আগ্রাবাদ, হালিশহর, এইসব এলাকাতে আগ্রাবাদে পানিতে সয়লাব হত। এরকমও হয়েছে তৎকালীন মেয়রের বাড়ি মুরাদপুর বহদ্দারহাটে মেয়র ঘর থেকে বের হতে পারেন নাই। পরে আস্তে আস্তে পানি একটু সরে যাওয়ার পরে রিকশায় করে উনি বের হয়েছেন। কিন্তু ২০২৫ সালে আপনারা সেই পিকচার দেখেননি। ২০২৫ সালে সালে বহদ্দারহাটে পানি উঠেনি। মির্জাপুলে পানি উঠেনি। চকবাজারে পানি উঠেনি। বাকলিয়াতে পানি উঠেনি। আগ্রাবাদে পানি উঠেনি। আগে পানি নিচু এলাকাগুলোতে একসময় যেভাবে উঠতো ২০২৫ সালে সেভাবে পানি উঠেনি। এটা সমন্বিত প্রচেষ্টার কারণে সেটা সম্ভব হয়েছে এবং সেটার মুখ্য ভূমিকায় ছিল আর্মি ইঞ্জিনিয়ারিং। আমি তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই।

তিনি বলেন, এ বছর প্রবর্তকে যে পানি উঠেছে সেটাকে একটা দুর্ঘটনা বলব আমি। কারণ যে বৃষ্টি ভারী বৃষ্টি হয়েছে সেটা আসলে বৈশাখের জন্য বেমানান। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হঠাৎ করে এ ধরনের ঘটনা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে সেটা হতে পারে। গত বছরে ৫০-৬০ ভাগ জলাবদ্ধতা আমরা কমাতে সক্ষম হয়েছি। এইবার ইনশাল্লাহ আমাদের কমিটমেন্ট ৭০-৮০ ভাগ জলাবদ্ধতা মুক্ত চট্টগ্রাম হবে। আমরা এই ব্যাপারে বদ্ধপরিকর।

মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত হকার ব্যবসা এবং প্লাস্টিক-পলিথিন বর্জ্যকে দায়ী করে বলেন, ইদানীং আমরা লক্ষ্য করছি, নগরীতে রাস্তায় হকার ব্যবসা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। অনেকেই ফুটপাত ও সড়ক দখল করে ব্যবসা করছেন এবং যত্রতত্র ময়লা ফেলছেন। এসব বর্জ্য পরিষ্কার করতে আমাদের পরিচ্ছন্ন কর্মীদের দিনরাত কাজ করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ ছাড়া বিকল্প নেই।

মেয়র নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘বর্ষাকালকে সামনে রেখে জোনভিত্তিক ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করতে হবে। যারা সড়ক দখল করে ব্যবসা করছে এবং অপরিকল্পিতভাবে ময়লা ফেলছে, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্তমানে আমাদের ড্রেনেজ ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শত্রু। এসব বর্জ্য পানিতে মিশে না গিয়ে নালা-খালে জমে পানি চলাচল বন্ধ করে দিচ্ছে। এর ফলে একদিকে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে কর্ণফুলী নদী ভয়াবহ দূষণের শিকার হচ্ছে। নগরবাসীকে এ বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে’।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম নগরীর প্রবর্তক মোড় এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবন দ্রুত অপসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, জননিরাপত্তার স্বার্থে ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো দ্রুত ভেঙে ফেলতে হবে, অন্যথায় সামান্য ভূমিকম্প বা দুর্ঘটনায় বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।

সভায় তিনি বলেন, ‘প্রবর্তক এলাকায় দুটি ভবন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। একটি প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির ভবন এবং আরেকটি ইউএস কর্নার সংলগ্ন স্ট্রাকচার। ভবনগুলোর অবস্থা দেখে মনে হয়েছে, যেকোনো সময় ধসে পড়ে মানুষের প্রাণহানির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে সামান্য ভূমিকম্প হলেও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ভেঙ্গে ফেলা ভবনটির অবশিষ্ট অংশ এখনও দাঁড়িয়ে আছে, সেটি দ্রুত অপসারণ করা প্রয়োজন’।

জবাবে মেয়র চসিকের প্রধান প্রকৌশলীকে আগামী ১০ দিনের মধ্যেই ভবনটি ভেঙে ফেলার উদ্যোগ গ্রহণের নির্দেশনা দেন। সভায় উপস্থিত কর্মকর্তারা জানান, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় কারিগরি মূল্যায়ন শেষে দ্রুত উচ্ছেদ ও অপসারণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে, যাতে নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।

সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার বলেন, জলাবদ্ধতাকে ৮০ শতাংশ কমাতে যা যা করার আমরা করাবো। ৩৬ টা খাল মিলে ১০০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য পুরোটাকে আমরা গতিশীল করে দেব। এ বিষয়ে যে কোন সহযোগিতার জন্য আমাদের জানালে আমরা পদক্ষেপ নিব। আপনারা এতটুকু আশ্বস্ত থাকেন যেখানে দেশের প্রধানমন্ত্রী সরাসরি এটাকে মনিটর করছেন এখানে রাষ্ট্রযন্ত্র সেটা পারবে না এটা আমি বিশ্বাস করি না। আমরা সবাই মিলে এ লক্ষ্য অর্জন করব ইনশাল্লাহ।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জলাবদ্ধতা নিরসনে শুধু খাল পরিষ্কার করাই যথেষ্ট নয়, বরং পরিষ্কারের পর সেগুলোর নিয়মিত তদারকি ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, নাগরিক সচেতনতার অভাব এবং খাল-নালায় পুনরায় ময়লা ফেলার প্রবণতা জলাবদ্ধতা সমস্যাকে জটিল করে তুলছে।

সভায় তিনি নিজের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘চট্টগ্রামে যোগদানের আগে আমি নারায়ণগঞ্জে জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। সেখানেও একই ধরনের জলাবদ্ধতা সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলাম। বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ চলছিল, কিন্তু দেখা গেল যেখান দিয়ে পানি নদীতে যাওয়ার কথা, সেই পয়েন্টই বন্ধ হয়ে আছে। ফলে পুরো শহর পানিতে তলিয়ে যাচ্ছিল।’

ডিসি আরো বলেন, ‘পরবর্তীতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে আমি প্রায় ৯৯ লাখ টাকা বরাদ্দ পাই। সেই অর্থ দিয়ে ৩৫ থেকে ৩৬ ট্রাক ময়লা খাল থেকে অপসারণ করা হয়েছিল। কিন্তু আমরা খাল পরিষ্কার করার কয়েকদিনের মধ্যেই মানুষ আবার সেখানে ময়লা ফেলতে শুরু করে। আমি নিজে তিন-চারদিন পর গিয়ে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। যেই খাল পরিষ্কার করে সুন্দর করা হয়েছিল, অল্প সময়ের মধ্যেই সেটি আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে।’

নাগরিক অসচেতনতার বিষয়টি তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘নিয়মিত ময়লা অপসারণের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও অনেকে সরাসরি খালে ময়লা ফেলে দেয়। এটিই বাস্তবতা। এভাবে চলতে থাকলে শুধু প্রকল্প বাস্তবায়ন করে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া সম্ভব হবে না। বিপুল পরিমাণ পানি যে খাল দিয়ে প্রবাহিত হয় সেখানে যদি আবার ময়লা-আবর্জনা জমে, তাহলে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে না।’

জেলা প্রশাসক এ সময় খাল পরিষ্কারের পর নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য একটি বিশেষ মনিটরিং টিম গঠনের প্রস্তাব দেন।

তিনি বলেন, ‘যেসব খালে কাজ হচ্ছে, কাজ শেষ হওয়ার পর কয়েকদিন ধরে সেগুলো পর্যবেক্ষণে রাখা প্রয়োজন। একটি টিম গঠন করে প্রতিদিনের সচিত্র প্রতিবেদন এই কমিটি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে উপস্থাপন করা হলে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা সহজ হবে এবং টেকসই সমাধান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’

সভায় কমিটির সদস্যবৃন্দ এবং বিভিন্ন সেবা সংস্থার উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ বক্তব্য রাখেন ।

চাটগাঁ নিউজ/জেএইচ

Scroll to Top