গুমাইবিলে আমনে রেকর্ডের সম্ভাবনা, গ্রাস করছে দখল ও অবকাঠামো!

জগলুল হুদা: পাহাড়ের পাদদেশে বিস্তৃত উত্তর চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্র ও দেশের অন্যতম বৃহত্তম শস্যভাণ্ডার খ্যাত রাঙ্গুনিয়ার ‘গুমাই বিল’ এখন সেজেছে অপরূপ এক সবুজ সাজে। বর্ষা শেষে বিস্তীর্ণ বিলজুড়ে আমন ধানের সবুজ সমারোহ, চারপাশের পাহাড় আর নীল আকাশ মিলে তৈরি করেছে এক মনোরম দৃশ্য। দূর থেকে তাকালে মনে হয় পুরো বিলটি যেন সবুজের এক নরম চাদরে মোড়া। কৃষকের সোনালী স্বপ্নের এই মাঠে ধানের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনায় হাসি ফুটেছে কৃষক ও কৃষি বিভাগের মুখে। তবে সম্ভাবনার এই ক্যানভাসের পাশেই রয়েছে জমি দখল ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের এক দীর্ঘশ্বাস!

গুমাইবিলে সরজমিন ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ আমনখেতেই এখন সোনালী শীষের উঁকিঝুঁকি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এবার আমনের উৎপাদন আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার জোরালো সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি আমন মৌসুমে গুমাই বিলে রেকর্ড ৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছে, যেখানে বিগত বোরো মৌসুমে আবাদের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৪৬০ হেক্টর এবং হেক্টর প্রতি গড় ফলন হয়েছিল ৬ মেট্রিক টন। সমগ্র রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় সদ্য সমাপ্ত আমন মৌসুমে মোট ১৫ হাজার ৪৫৭ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে হাইব্রিড জাতের ৬৪২ হেক্টর, উফশী ১৪ হাজার ৬৮৫হেক্টর এবং স্থানীয় জাতের ১২০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। লোকমুখে প্রচলিত আছে, দেশের প্রায় আড়াই দিনের সার্বিক চাল বা খাদ্য চাহিদা একাই মেটাতে সক্ষম চট্টগ্রামের এই বিশাল শস্যভাণ্ডার।

রাঙ্গুনিয়ার গুমাই বিলে ধানগাছের পরিচর্যা করছে কৃষক

এদিকে আমন কাটার প্রস্তুতি ও বোরো মৌসুমের আগাম প্রস্তুতি নিয়ে কথা হয় কৃষকদের সঙ্গে। গুমাইবিলের কৃষক মো. রেজাউল করিম জানান, ‘আট কানি জমিতে বোরো আবাদ করে গড়ে ৬ মেট্রিক টন করে ধান পেয়েছিলাম। বর্তমানে মোটা ধান ৩৩০ টাকা এবং চিকন ধান ৩৫০ টাকা আড়ি (১০ কেজি) দামে বিক্রি হচ্ছে। ধানের ভালো দাম পাওয়ায় আমনেও একই পরিমাণ জমিতে আবাদ করেছি এবং বেশ ভালোই ফলন পাবো বলে প্রত্যাশা করি।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বেলাল হোসেন জানান, আমনের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কৃষকদের প্রণোদনা ও সর্বাত্মক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে আমন আবাদ পরিপুষ্ট হতে শুরু করেছে। আগামী এক দেড় মাসের মধ্যে ফলন আসবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।

এদিকে গুমাই বিলের দৃশ্যমান এই সম্ভাবনার উল্টো পিঠে রয়েছে আশঙ্কাজনক এক চিত্র। সরকারি হিসাব মতেই— গত এক দশকে দখল, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ইটভাটা স্থাপনের কারণে গুমাই বিলের প্রায় ৫০ হেক্টর উর্বর কৃষিজমি স্থায়ীভাবে হারিয়ে গেছে। উত্তর চট্টগ্রামের উপশহর ‘চন্দ্রঘোনা’ থেকে মরিয়মনগর চৌমুহনী ও রাঙ্গুনিয়া পৌর এলাকার নগরায়ণ এখন গুমাই বিলকে গিলে খাচ্ছে। কাপ্তাই সড়ক সংলগ্ন বিলের জমিতে গড়ে উঠেছে প্রায় পাঁচ শতাধিক স্থায়ী ও অস্থায়ী স্থাপনা। বিলের উপকণ্ঠে চন্দ্রঘোনা ও নিশ্চিন্তাপুর এলাকায় ছয়টি ইটভাটা স্থাপন করা হয়েছে, যা পরিবেশের পাশাপাশি কৃষিজমির স্বাভাবিক উর্বরতা ধ্বংস করছে। বিলের অভ্যন্তরীণ উন্নত সড়ক ও যাতায়াত ব্যবস্থা না থাকা এবং পর্যাপ্ত সেচ কাঠামোর অভাবে মূল সড়ক থেকে দূরবর্তী প্রায় ১ হাজার হেক্টর জমি আবাদের বাইরে বা অনাবাদি থেকে যাচ্ছে।

গুমাই বিল রক্ষা ও দখলমুক্তকরণ প্রসঙ্গে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাজমুল হাসান জানান, ‘গুমাই বিলের ঐতিহ্য ও আবাদি জমি রক্ষায় আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। ইতোমধ্যে বিলের জায়গায় নির্মাণাধীন বেশ কিছু স্থাপনার কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ইটভাটাসহ অন্যান্য অবৈধ দখলের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

সচেতন মহল জানান, গুমাই বিল কেবল রাঙ্গুনিয়া বা চট্টগ্রামের সম্পদ নয়, জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একদিকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও উফশী-হাইব্রিড জাতের আবাদে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে অপরিকল্পিত ইমারত নির্মাণ ও জমি দখল বিলের ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলছে।

কৃষিবিদ ও সুশীল সমাজের মতে, বিলের অভ্যন্তরীণ আধুনিক সেচ ও সড়ক অবকাঠামো দ্রুত স্থাপন এবং জমি ভরাট সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা না গেলে দেশের অন্যতম বৃহৎ এই শস্যভাণ্ডার চিরতরে তার ঐতিহ্য হারাতে পারে।

চাটগাঁ নিউজ/জেএইচ

Scroll to Top