নিজস্ব প্রতিবেদক : সারিবদ্ধভাবে রাখা বাক্সগুলোর কোনোটিতে রয়েছে রাসেল ভাইপার, কোনোটিতে পদ্মগোখরা, আবার কোনোটিতে রয়েছে সবুজ বোড়া। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিচরণ করা এসব বিষধর সাপের বিষ সংগ্রহ করে দেশীয় প্রজাতির সাপের জন্য অ্যান্টিভেনম তৈরির গবেষণা চলছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে অবস্থিত ভেনম রিসার্চ সেন্টারে। তবে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা কার্যক্রম এখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
গবেষণা কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সেখানে ১১ প্রজাতির ৩৭০টি বিষধর সাপ রয়েছে। এসব সাপের বিষ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের পাশাপাশি দেশীয় প্রজাতির সাপের বিষের বিপরীতে কার্যকর অ্যান্টিভেনম তৈরির গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন গবেষকরা।
সাপের কামড়ে মৃত্যুর হার কমানোর লক্ষ্য নিয়ে ২০১৮ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথমবারের মতো চট্টগ্রামে ভেনম রিসার্চ সেন্টারের যাত্রা শুরু হয়। গবেষকদের দাবি, এরই মধ্যে বেশ কিছু গবেষণায় তারা সফলতা পেয়েছেন। প্রায় দুই বছর আগে রাসেল ভাইপারের বিষের বিপরীতে অ্যান্টিভেনম তৈরির পরীক্ষামূলক গবেষণাতেও সফলতা পেয়েছেন তারা।
তবে গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থের সংকট। গবেষকদের হিসাবে, প্রায় ৩৭০টি সাপের খাবার, পরিচর্যা এবং গবেষণাকাজে নিয়োজিত কর্মীদের বেতনসহ প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু এ ব্যয়ের বিপরীতে সরকারের কোনো নিয়মিত অনুদান বা আর্থিক সহযোগিতা নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভেনম রিসার্চ সেন্টারের কো-ইনভেস্টিগেটর ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ আবু সাইদ বলেন, দেশীয় প্রজাতির সাপের ওপর গবেষণা করে অ্যান্টিভেনম তৈরির উদ্দেশ্যেই ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। এরই মধ্যে বেশ কিছু গবেষণায় সফলতা এসেছে। কিন্তু বর্তমানে আর্থিক সংকটের কারণে গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ধারদেনা ও ব্যক্তিগত অর্থের ওপর নির্ভর করেই কোনোভাবে কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, বর্তমানে গবেষণা কেন্দ্রে প্রায় ১ দশমিক ৫ কেজি সাপের বিষ সংরক্ষিত রয়েছে। সরকারি সহযোগিতা পাওয়া গেলে দেশীয় প্রজাতির সাপের বিষের বিপরীতে অ্যান্টিভেনম তৈরির গবেষণা আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। এতে একদিকে সাপে কাটা রোগীদের মৃত্যুঝুঁকি কমবে, অন্যদিকে বিদেশ থেকে অ্যান্টিভেনম আমদানির ওপর নির্ভরশীলতাও কমতে পারে।
গবেষণা কেন্দ্রের কর্মী আসির উদ্দীন বলেন, আর্থিক সংকটের কারণে সাপগুলোর খাবার ও খাবার হিসেবে ব্যবহৃত ইঁদুরের সরবরাহও কমে গেছে। প্রয়োজনের তুলনায় কম খাবার দিয়ে কোনো রকমে সাপগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে। এতে গবেষণার স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
আরেক কর্মী আউয়াল উদ্দীন জানান, সাপের প্রজননের মাধ্যমে আরও বেশি পরিমাণে বিষ সংগ্রহ করা সম্ভব। কিন্তু বর্তমানে থাকা সাপগুলোর খাবার ও পরিচর্যার ব্যয় বহন করতেই প্রতিষ্ঠানকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে নতুন করে সাপের সংখ্যা বাড়ানো কিংবা বিষ উৎপাদনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশে সাপে কাটা রোগীদের চিকিৎসায় বর্তমানে ভারত থেকে আমদানি করা অ্যান্টিভেনম ব্যবহার করা হচ্ছে। দেশীয় প্রজাতির সাপের বিষের বিপরীতে কার্যকর অ্যান্টিভেনম তৈরি করা গেলে একদিকে যেমন আমদানি নির্ভরতা কমবে, অন্যদিকে সাপে কাটা রোগীদের মৃত্যুঝুঁকিও কমানো সম্ভব হবে।
গবেষকদের দাবি, দেশীয় প্রজাতির সাপের বিষ নিয়ে দীর্ঘদিনের গবেষণায় এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। বিশেষ করে রাসেল ভাইপারের বিষের বিপরীতে অ্যান্টিভেনম তৈরির পরীক্ষামূলক গবেষণায় সাফল্য ভবিষ্যৎ গবেষণার সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়েছে। তবে আর্থিক সংকটের কারণে এই গবেষণা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে দেশীয় প্রজাতির সাপের বিষ নিয়ে চলমান গবেষণায় বড় ধরনের বাধা তৈরি হতে পারে। তাই গবেষণা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে সরকারের আর্থিক সহযোগিতা চেয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
চাটগাঁ নিউজ/হোসাইন/এসএ






