বিনোদন ডেস্ক: বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে উজ্জ্বল এক নাম আইয়ুব বাচ্চু। গায়ক হিসেবে যেমন শ্রোতাদের হৃদয় জয় করেছেন, তেমনি গিটার হাতে মঞ্চে তৈরি করেছেন নিজের স্বতন্ত্র জগৎ। রক সংগীতের সঙ্গে তার কণ্ঠ ও গিটারের অনন্য মেলবন্ধন তাকে পরিণত করেছে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ড তারকায়। আজ রবিবার (১৬ আগস্ট) এই কিংবদন্তি শিল্পীর জন্মদিন।
১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরের এনায়েত বাজার এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন আইয়ুব বাচ্চু। বেঁচে থাকলে আজ ৬৪ বছরে পা দিতেন তিনি। তবে ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর মাত্র ৫৬ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে না ফেরার দেশে চলে যান বাংলা ব্যান্ড সংগীতের এই নক্ষত্র।
কৈশোর পেরিয়ে কলেজজীবনেই সংগীতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হন আইয়ুব বাচ্চু। ১৯৭৬ সালে ‘আগলি বয়েজ’ নামে একটি ব্যান্ড গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার সংগীতযাত্রা। পরের বছর তিনি ‘ফিলিংস’ ব্যান্ডে যোগ দেন। ১৯৮০ সাল পর্যন্ত দলটির সঙ্গে কাজ করার পর একই বছরে দেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘সোলস’-এর প্রধান গিটারবাদক হিসেবে যুক্ত হন। দীর্ঘ এক দশক সোলসের সঙ্গে থেকে নিজের গিটারবাদনের দক্ষতাকে আরও সমৃদ্ধ করেন তিনি।
১৯৯১ সালে নিজের ব্যান্ড গঠনের উদ্যোগ নেন আইয়ুব বাচ্চু। ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’ নামে যাত্রা শুরু করা দলটিই পরবর্তী সময়ে ‘লাভ রান্স ব্লাইন্ড’ বা ‘এলআরবি’ নামে ব্যাপক পরিচিতি পায়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রায় ২৭ বছর তিনি এই ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
গিটার হাতে মঞ্চে তার উপস্থিতি ছিল আলাদা এক আকর্ষণ। গানের পাশাপাশি গিটার বাজানোর অসাধারণ দক্ষতার কারণে ভক্তদের কাছে তিনি পরিচিতি পান ‘বস’ নামে। রক সংগীতকে জনপ্রিয় করে তোলার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্যান্ড সংগীতের প্রতি আগ্রহ তৈরিতেও তার ছিল বড় ভূমিকা।
আইয়ুব বাচ্চুর সংগীতজগৎ অবশ্য শুধু ব্যান্ড বা রকের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। আধুনিক গান, লোকগীতি এবং চলচ্চিত্রের গানেও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি। তার কণ্ঠে ও সুরে তৈরি হয়েছে অসংখ্য জনপ্রিয় গান, যেগুলো এখনো শ্রোতাদের কাছে সমান আবেদন তৈরি করে।
একক শিল্পী হিসেবেও ছিল তার সফল ক্যারিয়ার। ১৯৮৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হয় তার প্রথম একক অ্যালবাম ‘রক্তগোলাপ’। এরপর ‘ময়না’ অ্যালবামের মাধ্যমে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত ‘কষ্ট’ অ্যালবামটি তার ক্যারিয়ারে নতুন মাত্রা যোগ করে। এই অ্যালবামের ‘কষ্ট কাকে বলে’, ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, ‘অবাক হৃদয়’ ও ‘আমিও মানুষ’-এর মতো গান শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
পরবর্তী সময়ে ‘সময়’, ‘একা’, ‘প্রেম তুমি কি’, ‘দুটি মন’, ‘কাফেলা’, ‘রিমঝিম বৃষ্টি’, ‘বলিনি কখনো’ ও ‘জীবনের গল্প’সহ বেশ কয়েকটি একক অ্যালবাম প্রকাশ করেন তিনি।
অন্যদিকে এলআরবির সঙ্গেও একের পর এক সফল অ্যালবাম উপহার দেন আইয়ুব বাচ্চু। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত ‘এলআরবি ১’ ও ‘এলআরবি ২’ দেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত। এরপর ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত ‘সুখ’ অ্যালবামটি বাণিজ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি শ্রোতাদের মধ্যেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। পরে ‘তবুও’, ‘ঘুমন্ত শহরে’, ‘ফেরারি মন’, ‘আমাদের’, ‘বিস্ময়’, ‘মন চাইলে মন পাবে’, ‘অচেনা জীবন’, ‘মনে আছে নাকি নাই’, ‘স্পর্শ’, ‘যুদ্ধ’ ও ‘রাখে আল্লাহ মারে কে’সহ একাধিক অ্যালবাম প্রকাশ করে এলআরবি।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে আইয়ুব বাচ্চু উপহার দিয়েছেন অসংখ্য কালজয়ী গান। ‘চলো বদলে যাই’, ‘হাসতে দেখো’, ‘এখন অনেক রাত’, ‘রূপালি গিটার’, ‘মেয়ে’, ‘ফেরারি মন’, ‘উড়াল দেবো আকাশে’, ‘বাংলাদেশ’, ‘এক আকাশের তারা’, ‘সেই তারা ভরা রাতে’, ‘কবিতা’, ‘যেওনা চলে বন্ধু’সহ তার বহু গান এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
সংগীতের পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনেও ছিলেন পরিবারমুখী আইয়ুব বাচ্চু। ১৯৯১ সালের ৩১ জানুয়ারি ফেরদৌস আক্তার চন্দনাকে বিয়ে করেন তিনি। তাদের সংসারে রয়েছে দুই সন্তান—মেয়ে ফাইরুজ সাফরা আইয়ুব ও ছেলে আহনাফ তাজওয়ার আইয়ুব।
শারীরিকভাবে তিনি আজ নেই, কিন্তু তার কণ্ঠ, সুর আর গিটারের ঝংকার এখনো বাঙালির সংগীতপ্রেমী হৃদয়ে অনুরণিত হয়। তাই জন্মদিনে প্রিয় শিল্পীকে স্মরণ করে ভক্তদের কণ্ঠে যেন একই কথা—আইয়ুব বাচ্চু চলে গেলেও তার গান ও রূপালি গিটারের সুর কখনো হারিয়ে যাবে না।
চাটগাঁ নিউজ/এমকেএন





