ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করতে চান শেখ হাসিনা: রয়টার্স

চাটগাঁ নিউজ ডেস্ক : বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার দলের পলাতক নেতাকর্মীদের নিয়ে ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের কাছে দাবি করেছেন। তারা আত্মসমর্পণের কথা ভাবছেন বলেও রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন তিনি।

তবে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে যাওয়া শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরা নিয়ে আলোচনা এর আগেও সামনে এসেছে। সম্প্রতি ভারতীয় একটি গণমাধ্যম শেখ হাসিনার বরাত দিয়ে এ বছরই তার বাংলাদেশে ফেরার খবর দেওয়া হয়।

আবার ২০২৫ সালে অক্টোবরেও রয়টার্সকে দেওয়া আরেকটি বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ দেশের ভবিষ্যৎ ভূমিকা পালনে ফিরে আসবে, সেটা সরকারে হোক আর বিরোধী দলে হোক। তবে তখন তার নিজের দেশে ফেরার বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট করে কিছু উল্লেখ করেনি।

এর আগে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে লিখিতভাবে প্রশ্নের উত্তর দিলেও আগে সরাসরি কথা বলেননি শেখ হাসিনা। রয়টার্স বলছে, টেলিফোনে তার এই সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছে।

শেখ হাসিনা রয়টার্সকে বলেন, “আমাদের প্রায় সব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধেই মামলা হয়েছে এবং তাদের অনেকে আত্মগোপনে আছেন। তাই আমি বলেছি, এবার আমি দেশে ফিরছি, আর একদিন তোমরাও সবাই এসো। আমরা সবাই একসঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণ করবো।”

প্রসঙ্গত, চব্বিশের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে তার দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপরও বাংলাদেশে সরকারিভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি আছে।

শেখ হাসিনার সঙ্গে একই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ নেতা আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধের মৃত্যুদণ্ডে রায় আছে। এছাড়া জুলাই আন্দোলনে সময় নানা অভিযোগ এবং দুর্নীতির অভিযোগেও বিপুল সংখ্যক মামলা আছে।

এদিকে, শেখ হাসিনার এই বক্তব্য নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। দেশে ফেরার প্রশ্নে শেখ হাসিনার বক্তব্যের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়ায় জুলাই গণ-অভ্যত্থানে হত্যাকাণ্ডের বিচার চলার বিষয়টিতে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একজন উপদেষ্টা।

শেখ হাসিনা টেলিফোনে রয়টার্সকে বলেছেন, তিনি ও আওয়ামী লীগের সদস্যরা স্বেচ্ছায় বাংলাদেশে ফিরতে চান। তারা আদালতে হাজির হয়ে আত্মসমর্পণ করতে চান বাংলাদেশে ফিরলে গ্রেফতার, এমনকি হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে পারেন বলেও তিনি মনে করেন।

বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত প্রায় এক ঘণ্টা টেলিফোনে শেখ হাসিনা এই সাক্ষাৎকার দেন বলেও রয়টার্স জানিয়েছে।

বাংলাদেশের সরকার তাকে ভারত থেকে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তারা আমাকে ফিরিয়ে নিতে চায়। আমাকে ফেরত পাঠানোর জন্য তারা বারবার ভারতে চিঠি পাঠাচ্ছে। আমি নিজেই ফিরে যাব।”

আওয়ামী লীগের পতনের পর ক্ষমতায় আসা সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার এবং গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় বসা বিএনপি সরকারের সদস্যরা বারবারই বলেছেন, শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতে বার বার চিঠি পাঠানো হচ্ছে। তবে ভারতের দিক থেকে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।

ডিসেম্বরে ঠিক কবে বাংলাদেশে ফিরবেন, কখন বা কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন, তা উল্লেখ করতে অস্বীকৃতি জানান শেখ হাসিনা। ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে ঢাকার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ হয়নি বলেও তিনি জানিয়েছেন।

“গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার এবং ন্যায়বিচার—এসব গোপন আলোচনার বিষয় নয়,” এই মন্তব্য করে শেখ হাসিনা এটাও বলেন যে, কারাগারে যাওয়া নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন, কারণ এর আগেও তাকে একাধিকবার গ্রেফতার করা হয়েছে।

চব্বিশে দেশ ছাড়ার কারণ হিসেবে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার বাসভবনের দিকে জনতা এগিয়ে আসার সময় তার প্রাণনাশের হুমকি ছিল।

সরকারে থাকার সময় আওয়ামী লীগের ভুল হয়ে থাকতে পারে- এধরনের মন্তব্য করলেও কোনো ধরনের দায় স্বীকার করেননি শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, “কোনো সরকার দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে ভুল হতেই পারে– কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু একটি সরকারের ভালো-মন্দ, সঠিক-ভুল বিচার করার অধিকার জনগণের। আমি সেই বিচার জনগণের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি।”

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের ১২ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সব সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল।

বিএনপি সরকারও সেটাই বহাল রেখেছে। সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত কোনো সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ গত এপ্রিলে অনুমোদন করা হয়েছে জাতীয় সংসদ।

তবে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনার ইঙ্গিতও দিয়েছেন শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তিনি বাংলাদেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টি আসন নিয়ে অনলাইন বৈঠক করেছেন বলে রয়টার্সকে জানান।

তিনি বলেন, “তারা আমাকে দোষী সাব্যস্ত করে থাকতে পারে এবং আমি হয়তো নির্বাচনে অংশ নিতে পারব না। কিন্তু আওয়ামী লীগকে কেন স্থগিত করা হবে? আমরা যদি খারাপ কাজ করে থাকি, তাহলে সিদ্ধান্ত জনগণই নিক।”

দেশে ফেরার প্রশ্নে শেখ হাসিনার বক্তব্যের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়ায় জুলাই গণ-অভ্যত্থানে হত্যাকাণ্ডের বিচার চলার বিষয়টিতে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একজন উপদেষ্টা।

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপি জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বিবিসি বাংলাকে বলেন, “ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হত্যাযজ্ঞের একটি মামলায় বিচার শেষে ঢাকায় আদালতে ফাঁসির রায় হয়েছে। আরও অনেক হত্যা মামলায় আদালতে তার বিচার চলছে।”

এই বিচারের বিষয় উল্লেখ করে মি. রিজভী বলেন, “হাসিনার অপরাধের ব্যাপারে আদালত সিদ্ধান্ত নেবে।”

একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মি. রিজভী বলেন, শেখ হাসিনা বা ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতারা দেশে ফিরবেন কি ফিরবেন না, বা তারা কি করবেন-সেটা তাদের বিষয়, তাদের দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে তাদের বিচার নিশ্চিত করার পক্ষে বিএনপি সরকারের অবস্থানের কথা উল্লেখ করেন রুহুল কবির রিজভী।

তিনি বলেন, “জুলাই আন্দোলনে উনি (শেখ হাসিনা) যে হত্যার মহাযজ্ঞ চালিয়েছেন, শিশু-কিশোরদেরও হত্যা করেছেন। সেই হত্যাযজ্ঞের বিচার নিশ্চিত হোক, সেটা জনগণ চায়। আদালতে বিচার চলছে। ফলে অপরাধের ব্যাপারে বিচার হবে এবং আদালত সিদ্ধান্ত নেবে।

প্রসঙ্গত, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘঠিত হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধের ক্ষেত্রে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে ঢাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার করা হচ্ছে।

এই ট্রাইব্যুনালে একটি মামলায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনা ও তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে গত বছরের ১৭ নভেম্বর। ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আরও কয়েকটি মামলার বিচার প্রক্রিয়া চলছে।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যত্থানের সময়ের ঘটনায় সারা দেশে ৬৬৩টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলা রয়েছে ৪৫৩টি।

রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দেশে তার বিরুদ্ধে চলা বিচারের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেছেন, “আমার মনে হয়, বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলেই মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে এই আদালত কতটা প্রহসনমূলক- আর আমি সেটাই প্রমাণ করতে চাই।”

তার এই বক্তব্যের ব্যাপারে রুহুল কবির রিজবী বলেন, “উনি (শেখ হাসিনা) এ কথা বলছেন। আর উনার সময়ে যুদ্ধাপরাধের বিচার করতে গিয়ে সেই বিচারের একজন বিচারক রায় দেওয়ার আগে বাইরের একজনের সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন। সেই আলাপ ফাঁস হওয়ার পর ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। তিনিই এখন ন্যায় বিচারের কথা বলেন।

“বর্তমানে আদালতে সুচারুভাবে বিচার প্রক্রিয়া চলছে। সেখানে সরকার কোনো হস্তক্ষেপ করছে না। আদালত আইনসম্মতভাবে এবং স্বাধীনভাবে বিচার করছে করছে বলে দাবি করেন মি. রিজভী।

শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে কী হবে
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি এবং একাধিক মামলার আসামি শেখ হাসিনা চাইলেই বাংলাদেশে ফিরতে পারবেন কি না এবং ফিরতে পারলে তাকে কী পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে- সে বিষয়ে জানার চেষ্টা করেছে বিবিসি বাংলা।

আইন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, শেখ হাসিনার ফিরে আসা বেশ কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে, ফলে তার বাংলাদেশে আসায় বাধা আছে। তিনি ভারতে যাওয়ার সময় তার কাছে কূটনৈতিক বা লাল পাসপোর্ট ছিল এবং সেটি পরে বাতিল হওয়ায় তার কাছে কোনো ভ্যালিড পাসপোর্ট নেই। ফলে সরকারের কাছ থেকে ট্রাভেল পাস না পেলে তার স্বেচ্ছায় ফেরা কঠিন হতে পারে।

তবে শেখ হাসিনার দেশে আসতে আইনগত কোনো বাধা নেই বলে এর আগে সাংবাদিকদের বলেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি রয়েছে, তবে ব্যক্তি হিসেবে শেখ হাসিনার মুভমেন্টের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নাই; কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের সদস্য হিসেবে তার কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে।

“একজন ফিউজিটিভের পক্ষে কোনো আইনগত সুবিধা পাওয়ার কোনো সুযোগ নাই। তাকে অবশ্যই আসতে হবে, এই ট্রাইব্যুনালেই সারেন্ডার করতে হবে,” বলেন চিফ প্রসিকিউটর।

“এই ট্রাইব্যুনালেই সারেন্ডার করেই তাকে জেলে যেতে হবে এবং সেখান থেকে তাকে আপিল ফাইল করতে হবে বা যেই প্রক্রিয়ায় তিনি যেতে চান। সেক্ষেত্রে আপিল শুনানি সাপেক্ষেই কেবল পরবর্তী বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব তার আগে নয়” বলেন মি. ইসলাম।  সূত্র: বিবিসি বাংলা

চাটগাঁ নিউজ/এসএ

Scroll to Top