জগলুল হুদা: চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পোমরা ইউনিয়ন ও রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার সীমান্তবর্তী উত্তর নোয়াগাঁও এলাকায় সংস্কারের নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও কালভার্ট খুঁড়ে দীর্ঘদিন ধরে ফেলে রাখার অভিযোগ উঠেছে। এতে এলাকার প্রায় ৫০০ পরিবারের ৪ থেকে ৫ হাজার মানুষ প্রতিদিন চরম দুর্ভোগ ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
দীর্ঘ দুই বছর ধরে সংস্কারকাজ বন্ধ থাকায় বর্ষার শুরুতেই সড়কটি বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত ও কাদায় ভরে ডোবায় পরিণত হয়েছে। ফলে এলাকার মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
এলজিইডি রাঙ্গুনিয়া কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৯ কিলোমিটার সড়ক পাকাকরণ এবং ছয়টি কালভার্ট নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে শান্তিরহাট-গুইয়াতলা সড়কের উত্তর নোয়াগাঁও এলাকায় প্রায় এক কিলোমিটার সড়ক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। দুই বছর আগে পুরোনো পিচ ও খোয়া তুলে সড়কটি খনন করা হলেও পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ বন্ধ করে দেয়। এছাড়া রক্তছড়া ছড়ার ওপর নির্মাণাধীন একটি গুরুত্বপূর্ণ কালভার্টের কাজ গত আট মাস ধরে অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

চলতি বছরের জুন মাসেই প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কাজের অগ্রগতি অত্যন্ত হতাশাজনক বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ড ও পোমরা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সংযোগ সড়কের ওপর নির্মাণাধীন কালভার্টটি অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের উদ্যোগে কাঠের তক্তা বসিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন। স্কুল-কলেজ ও মাদরাসাগামী শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কালভার্টটি অসম্পূর্ণ থাকায় এলাকায় কেউ মারা গেলে জানাজার জন্য লাশবাহী খাটিয়া নিয়ে যাতায়াত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে হুইলচেয়ারে চলাচলকারী শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী রিফাত হাসান। পোমরা নঈমিয়া তৈয়্যবিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার এই শিক্ষার্থী গত আট মাস ধরে নিয়মিত মাদরাসায় যেতে পারছে না। আগামী ২৫ জুন তার চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু সড়ক ও কালভার্টের বেহাল অবস্থার কারণে সে কীভাবে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাবে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবার।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়ক নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। অনার্স শিক্ষার্থী আরফাতুল ইসলাম নয়ন বলেন, সড়ক খননের সময় ভেতরের ভালো মাটি সরিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। পরে বালু দিয়ে ভরাট করার পরিবর্তে নরম পাহাড়ি মাটি ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো সড়ক হাঁটুসমান কাদায় পরিণত হয়। বর্তমানে রিকশা, ভ্যানসহ সব ধরনের যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা মুহাম্মদ আজিজ উদ্দিন বলেন, কোনো বিকল্প সড়ক না রেখেই মূল রাস্তা কেটে ফেলা হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের উদাসীনতা ও প্রশাসনিক নজরদারির অভাবে হাজারো মানুষ অবরুদ্ধ জীবনযাপন করছেন।
মাদরাসার অধ্যক্ষ আবদুল মাবুদ বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে এমন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিষয়টি অভিভাবকদের মাঝেও চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
কাজের ধীরগতির বিষয়ে জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘এ আলী এন্টারপ্রাইজ’-এর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কাউকে পাওয়া যায়নি।

তবে এলজিইডি রাঙ্গুনিয়া উপজেলা প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য ঠিকাদারকে কঠোরভাবে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কাজের অগ্রগতি বিবেচনায় আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কিছু জটিলতার কারণে কাজ বন্ধ ছিল। বর্তমানে কাজ পুনরায় শুরু হয়েছে। কালভার্টের দুই পাশে মাটি ভরাট করে দু-এক দিনের মধ্যে সাময়িক যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হবে। আশা করছি, দ্রুতই পুরো কাজ সম্পন্ন হবে।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা সড়কে দাঁড়িয়ে তাদের দুর্ভোগের প্রতিবাদ জানান এবং রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাজমুল হাসানের কাছে মৌখিক অভিযোগ করেন।
এ বিষয়ে ইউএনও মো. নাজমুল হাসান বলেন, বিষয়টি গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘব এবং দ্রুত সড়ক ও কালভার্টের অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
চাটগাঁ নিউজ/এমকেএন





