‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’ আমজাদ নির্বাচনী দৌড় থেকে ছিটকে পড়লেন!
শিপ ব্রেকার্স নির্বাচন

নিজস্ব প্রতিবেদক : জাহাজভাঙা মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স এসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) নির্বাচন থেকে শেষ পর্যন্ত বাদ পড়লেন ঋণখেলাপি আমজাদ হোসেন চৌধুরী। নির্বাচনে তিনি সভাপতি প্রার্থী ছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) তালিকায় প্রায় ১২০০ কোটি টাকার ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’ হিসেবে নাম থাকায় প্রার্থিতার বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টের আগের আদেশ স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগ। ফলে আসন্ন নির্বাচনে তাঁর অংশগ্রহণের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল।

প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ শুনানি শেষে এই আদেশ প্রদান করেন।

শুনানি শেষে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক এই আদেশের সত্যতা নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘আপিল বিভাগ আমজাদ চৌধুরীর প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করা হাইকোর্টের আদেশটি স্থগিত করেছেন এবং রিট পিটিশনটি দ্রুত নিষ্পত্তি করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এই আদেশের পর এখন বিএসবিআরএ’র নির্বাচনী প্রক্রিয়া যথানিয়মে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আর কোনো আইনগত বাধা রইল না।’

এদিকে আদালতের রায়ের পর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিএসবিআরএ নির্বাচন পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান আফতাব উদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন বোর্ড সবসময় সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং প্রচলিত আইন মেনে কাজ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই ঋণখেলাপির দায়ে আমজাদ হোসেন চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছিল। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের এই আদেশের মাধ্যমে নির্বাচন বোর্ডের সঠিক সিদ্ধান্তটিই প্রমাণিত হয়েছে। এখন আমরা নতুন তফসিল অনুযায়ী সুষ্ঠুভাবে ভোট গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’

আদালত ও মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, রাইজিং স্টিল লিমিটেডের প্রতিনিধি আমজাদ হোসেন চৌধুরী বিএসবিআরএ’র কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচনে সভাপতি পদের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। তবে বিশাল অঙ্কের ঋণখেলাপির অভিযোগ থাকায় প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়েই নির্বাচন বোর্ড তাঁর প্রার্থিতা বাতিল ঘোষণা করে। পরবর্তীতে নির্বাচন আপিল বোর্ডে আপিল করলেও তা নামঞ্জুর হয়।

নির্বাচন বোর্ডের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আমজাদ চৌধুরী গত ১ জুন হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করলে আদালত তাঁর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন, যার ফলে পূর্বনির্ধারিত ৩ জুনের নির্বাচন স্থগিত হয়ে যায়। এরপর বিষয়টি আপিল বিভাগে গড়ালে আদালত সার্বিক দিক বিবেচনা করে হাইকোর্টের সেই আদেশ স্থগিত করেন এবং নির্বাচন বোর্ডের সিদ্ধান্তই বহাল রাখেন।

তবে এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে একে ‘পক্ষপাতমূলক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেছেন সভাপতি পদপ্রার্থী আমজাদ হোসেন চৌধুরী। তিনি চাটগাঁ নিউজকে বলেন, ‘যেখানে হাইকোর্ট আমাকে বৈধ প্রার্থী হিসেবে রায় দিয়েছে, সেখানে নির্বাচন কমিশনার কেন আপিল করতে যাবে! তাঁদের কি স্বার্থ? যারা আমাকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছে, যারা আমার সাথে নির্বাচন করলে পরাজয় নিশ্চিত, তাদের প্ররোচনা ও এবং যোগসাজশে এটা করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, তবে আইনি লড়াই এখনও শেষ হয়নি। নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে আমি আমার অধিকার আদায়ের লড়াই চালিয়ে যাব। ইনশাআল্লাহ শেষ পর্যন্ত আমার জয় হবে।’

ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ ও আইনজীবীরা জানান, দেশের প্রচলিত বাণিজ্য সংগঠন আইন (ট্রেড অর্গানাইজেশন অ্যাক্ট) অনুযায়ী ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’ হিসেবে চিহ্নিত কোনো ব্যক্তি কোনো বাণিজ্যিক বা ব্যবসায়ী সংগঠনের নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন না। আপিল বিভাগের এই চূড়ান্ত আদেশের পর সংগঠনটির নির্বাচনী প্রক্রিয়া আবার নতুন করে শুরু হতে যাচ্ছে।

আমজাদ চৌধুরী চিটাগাং চেম্বার অব কমার্সের সিনিয়র সহসভাপতি। তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আসলাম চৌধুরীর ছোট ভাই। আসলাম চৌধুরী গত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে বিজয়ী হন।

প্রসঙ্গত, গত ৩ জুন চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসন ব্লুতে শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা হলো ৮৬ জন। নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন ১৮ জন। এর মধ্যে সভাপতি পদে প্রার্থী হয়েছেন দুজন। এরা হলেন- দেশের খ্যাতনামা শিল্পগ্রুপ পিএইচপি ফ্যামিলির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মহসিন ও রাইজিং স্টিল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমজাদ চৌধুরী। কিন্তু আমজাদ চৌধুরী নির্বাচন থেকে বাদ পড়েছেন। নির্বাচনে দুই বছর মেয়াদের জন্য সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি ও দুজন সহসভাপতি এবং সাতজন নির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হবেন।

এর আগে গত বছরের ২৫ অক্টোবর শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। নির্বাচনে ১১টি পদের বিপরীতে মনোনয়নপত্র জমা দেন ১১ জন। তখন আমজাদ চৌধুরীর ‘অযাচিত হস্তক্ষেপের’ কারণে ১৫ সেপ্টেম্বর ‘স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন’ করতে না পারার কারণ দেখিয়ে ইস্তফা দেয় নির্বাচন বোর্ড। ফলে আর নির্বাচন হয়নি।

এরপর গত বছরের ৩ নভেম্বর সংগঠনের সংঘবিধি লঙ্ঘন করে শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের সভাপতির পদ ‘দখল’ করেন আমজাদ চৌধুরী। সংগঠন পরিপন্থী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে আমজাদ চৌধুরীকে গত ৫ ফেব্রুয়ারি অপসারণ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এরপর বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের সচিব আবু সাফায়াৎ মুহাম্মদ শাহে দুল ইসলামকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। দায়িত্ব নিয়েই প্রশাসক গত ২ মার্চ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন।

চাটগাঁ নিউজ/এসএ

Scroll to Top