চাটগাঁ নিউজ ডেস্ক: পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশে সড়ক, রেল ও নৌপথে গত ১৫ দিনে মোট ৩৭৭টি দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ১ হাজার ২৮৮ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে সড়কপথে।
সোমবার (৩০ মার্চ) সকালে রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
সংগঠনটির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেল বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, ঈদযাত্রা শুরুর দিন ১৪ মার্চ থেকে কর্মস্থলে ফেরার দিন ২৮ মার্চ পর্যন্ত ১৫ দিনে সড়কে ৩৪৬টি দুর্ঘটনায় ৩৫১ জন নিহত এবং ১ হাজার ৪৬ জন আহত হয়েছেন। গত বছর ঈদুল ফিতরে ৩১৫টি দুর্ঘটনায় ৩২২ জন নিহত ও ৮২৬ জন আহত হওয়ার তুলনায় এবার দুর্ঘটনা বেড়েছে প্রায় ৮.৯৫ শতাংশ, মৃত্যু ৮.২৬ শতাংশ এবং আহতের সংখ্যা বেড়েছে ২১ শতাংশ।
একই সময়ে রেলপথে ২৩টি দুর্ঘটনায় ৩৫ জন নিহত ও ২২৩ জন আহত হয়েছেন। নৌপথে ৮টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৮ জন, আহত হয়েছেন ১৯ জন এবং ৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন। এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ১৭৮ জন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এবারও দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উঠে এসেছে মোটরসাইকেল। ঈদকালে ১২৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৫ জন নিহত এবং ১১৪ জন আহত হয়েছেন। যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৩৬ শতাংশ এবং মোট মৃত্যুর প্রায় ৩৮ শতাংশ।
যানবাহনভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দুর্ঘটনায় জড়িত যানবাহনের মধ্যে মোটরসাইকেলের হার ২৭.১৬ শতাংশ, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ১৭.৭৩ শতাংশ, বাস ১৬.২২ শতাংশ, ব্যাটারিচালিত রিকশা ১৫.২৮ শতাংশ, প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাস ৮.৪৯ শতাংশ, নছিমন-করিমন ৭.৭৩ শতাংশ এবং সিএনজিচালিত অটোরিকশা ৭.৩৫ শতাংশ।
দুর্ঘটনার স্থানভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৪৩ শতাংশ দুর্ঘটনা জাতীয় মহাসড়কে, ৩০ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে এবং ২২ শতাংশ ফিডার সড়কে ঘটেছে।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ঈদ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সভায় এবারও যাত্রীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়নি। তার অভিযোগ, পরিবহন খাতের প্রভাবশালী মহলের চাপে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলো নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করেনি।
তিনি আরও বলেন, যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ ও জবাবদিহিতা জরুরি, নইলে প্রতি বছর ঈদযাত্রা একই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার মধ্যেই থাকবে।
দুর্ঘটনার কারণসমূহ
১. দেশের সড়ক-মহাসড়কে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিক্সা ও অটোরিক্সার অবাধ চলাচল।
২. জাতীয় মহাসড়কে পর্যাপ্ত রোড সাইন, রোড মার্কিং ও সড়কবাতির অভাব; রেলক্রসিংয়ে হঠাৎ যানবাহন উঠে আসা।
৩. সড়কে মিডিয়ান বা রোড ডিভাইডারের অভাব এবং অন্ধবাঁকে গাছপালার কারণে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি।
৪. মহাসড়কের নির্মাণ ত্রুটি, যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি এবং ট্রাফিক আইন অমান্যের প্রবণতা।
৫. উল্টোপথে যানবাহন চলাচল, সড়কে চাঁদাবাজি এবং পণ্যবাহী যানে যাত্রী পরিবহন।
৬. অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও অতিরিক্ত যাত্রীবহন।
৭. বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চালানো এবং চালকদের অতিরিক্ত সময় ধরে ড্রাইভিং করা।
৮. ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কারণে যাত্রীদের ঝুঁকিপূর্ণভাবে (বাসের ছাদ, খোলা ট্রাক/পিকআপ, ট্রেনের ছাদ ইত্যাদি) ভ্রমণ।
দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সুপারিশসমূহ
১. সড়ক ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং স্মার্ট ভাড়া আদায় পদ্ধতি চালু করা।
২. মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিক্সার আমদানি ও নিবন্ধন নিয়ন্ত্রণ করা।
৩. জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে রাতের জন্য পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা নিশ্চিত করা।
৪. দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে যানবাহনের ফিটনেস প্রদান।
৫. বিআরটিএ অনুমোদিত ড্রাইভিং স্কুলে ৬০ ঘণ্টার বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ ছাড়া লাইসেন্স প্রদান বন্ধ করা।
৬. পরিবহন খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং মালিক সমিতির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করা।
৭. গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে সার্ভিস লেইন নির্মাণ।
৮. সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ করা এবং চালকদের ন্যায্য বেতন ও নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করা।
৯. মহাসড়কে ফুটপাত, পথচারী পারাপার ব্যবস্থা, রোড সাইন ও রোড মার্কিং স্থাপন।
১০. আধুনিক ও মানসম্মত বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি।
১১. মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং রোড সেফটি অডিট চালু করা।
১২. সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে দুর্ঘটনা গবেষণা ইউনিট চালু করা।
১৩. ঈদযাত্রা নিরাপদ করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ এবং ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ কমানো।
চাটগাঁ নিউজ/এমকেএন/জেএইচ





