চাটগাঁ নিউজ ডেস্ক: চট্টগ্রামের ২৮ সাংবাদিকসহ মোট ১০৯ জনের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধীর ব্যানারে অপহরণ চেষ্টা, আক্রমণ ও মিথ্যা সংবাদ প্রচারের অভিযোগে করা মামলার তদন্তে সত্যতা পায়নি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি আদালতে পিবিআই এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। পরে গতকাল রোববার (৮ মার্চ) বিষয়টি জানাজানি হয়। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, বাদীকে বারবার ডাকার পরও তিনি কোনো তথ্য দেননি এবং উল্লেখিত সাক্ষীদেরও কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো পরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, মামলার বাদীকে হাজির হয়ে তার বক্তব্য দিতে চারবার নোটিশ দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি মামলার বিষয়ে কোনো তথ্য দেননি। পরে তার বাসায় গেলে তিনি তথ্য দেবেন জানিয়ে আর যোগাযোগ করেননি। এ ছাড়া বাদী মামলায় যেসব সাক্ষীর নাম-ঠিকানা দিয়েছেন, তাদেরও পাওয়া যায়নি। মামলায় জব্দ করার মতো কোনো আলামতও পাওয়া যায়নি।
২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর আদালতে মামলাটি করেন নগরীর মোহরা সায়রা খাতুন কাদেরিয়া গার্লস হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ হাসিনা মমতাজ। পরে আদালত পিবিআইকে মামলাটি তদন্তের নির্দেশ দেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, সাংবাদিকেরা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় প্রকৃত ঘটনা গোপন করে মিথ্যা ও বানোয়াট সংবাদ প্রচার করেন। ৪ আগষ্ট বাদী যখন নিউমার্কেট এলাকায় ছিলেন, তখন আওয়ামী লীগের সশস্ত্র কর্মীরা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালান ও গুলি ছোড়েন। শিক্ষার্থীরা গলিতে লুকানোর চেষ্টা করলে, সাংবাদিকেরা তাদের মারধর করেন এবং আওয়ামী লীগের নেতাদের হাতে তুলে দেন। সাংবাদিকেরা প্রকৃত ঘটনাগুলো তুলে না ধরে উদ্দেশ্যমূলক সংবাদ প্রকাশ করেছেন।
মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী ও তার মা চট্টগ্রাম মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসিনা মহিউদ্দিন।
অভিযুক্ত সাংবাদিকদের মধ্যে রয়েছেন– দৈনিক আজাদীর শুকলাল দাশ, ঋত্বিক নয়ন, আমিনুল ইসলাম মুন্না; বাংলাদেশ প্রতিদিনের রিয়াজ হায়দার চৌধুরী ও আজহার মাহমুদ; সময় টিভির প্রমল কান্তি দে কমল; ইনডিপেনডেন্ট টিভির অনুপম শীল; চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক দেবদুলাল ভৌমিক; বাংলানিউজ২৪–এর তপন চক্রবর্তী, ফটোগ্রাফার উজ্জ্বল কান্তি ধর; পূর্বদেশের রাহুল দাস নয়ন; প্রতিদিনের বাংলাদেশের সুবল বড়ুয়া; বিএফইউজে নেতা কাজী মহসিন; একুশে টিভির রফিকুল বাহার ও একরামুল হক বুলবুল; চট্টগ্রাম প্রতিদিনের উপদেষ্টা সম্পাদক আয়ান শর্মা; সারাবাংলা ডট নেটের রমেন দাশ গুপ্ত; বিডিনিউজ২৪.কমের মিন্টু চৌধুরী ও উত্তম সেন গুপ্ত; সমকালের কুতুব উদ্দিন; দীপ্ত টিভির রুনা আনসারি; ডিবিসি নিউজের মাসুদুল হক ও বিশ্বজিৎ রাহা; ভোরের কাগজের সমরেশ বৈদ্য; সিপ্লাসের সৌরভ ভট্টাচার্য, রাশেদ মাহমুদ, আমাদের সময়ের ব্যুরো প্রধান হামিদ উল্ল্যাহ ও সাংবাদিক রতন কান্তি দেবাশীষ।
এ ছাড়া যুবলীগের নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী, ছাত্রলীগের সাবেক নেতা নূরুল আজিম রনি , ছাত্রলীগ অন্যান্য নেতা-কর্মীসহ ৫০ থেকে ৬০ জন অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয় মামলায়।
জানতে চাইলে মামলার বাদী হাসিনা মমতাজ বলেন, ‘আমি বাড়িতে ছিলাম। আমার ভাই গিয়েছিলেন পিবিআই অফিসে। এভাবে প্রতিবেদন দিতে পারে না পুলিশ। আমি আইনি ব্যবস্থা নেব।’
আদালত সূত্র জানায়, জুলাই আন্দোলনে হতাহতের ঘটনায় চট্টগ্রাম ও মহানগরে এ পর্যন্ত ১৪৮টি মামলা হয়েছে। এসব এজাহারনামীয় আসামির সংখ্যা ১৩ হাজার ২৭। এর বাইরে অজ্ঞাতনামা আসামির সংখ্যা অন্তত ৩০ হাজার।

এদিকে মামলার বাদি হাসিনা মমতাজ জোনাকী সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি নগরীর নজির আহমদ চৌধুরী রোড বাইলেন চেয়ারম্যান গলির বাসিন্দা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে সায়রা খাতুন কাদেরিয়া গার্লস হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষের পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তখন তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে পদ দখলে রাখা, অর্থ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তোলেন।
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ফোনালাপে হাসিনা মমতাজ জোনাকী বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মতো তাকেও পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চাপ দেওয়া হলে একপর্যায়ে কয়েকজন রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলাটি করতে বাধ্য হন। তিনি আরও বলেন, আদালতে মামলা উপস্থাপনের ঠিক আগ মুহূর্তে মামলার খসড়া তার হাতে দেওয়া হয়েছিল। তাড়াহুড়োর মধ্যে তিনি এজাহারটি পড়তে পারেননি এবং আসামিদের কাউকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না। এতজন সাংবাদিককে যে আসামি করা হয়েছে, সেটিও তিনি আগে জানতেন না বলে ওই ফোনালাপে উল্লেখ করেন এবং এ বিষয়ে অনুতাপও প্রকাশ করতে শোনা যায়।
চাটগাঁ নিউজ/জেএইচ





