চাটগাঁ নিউজ ডেস্ক: তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের চট্টগ্রাম সফরকে বানচাল করতে ফ্যাসিবাদের দোসর কতিপয় নামধারী সাংবাদিক সার্কিট হাউজে মব সৃষ্টি করে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে বলে অভিযোগ করেছে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের নেতৃবৃন্দ। তারা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) এক বিবৃতিতে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি জাহিদুল করিম কচি এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা মুরাদ এ দাবি জানান।
বিবৃতিতে বলা হয়, তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে দায়িত্বরত সাংবাদিকদের ওপর উস্কানিমূলক ও উত্তেজনাপূর্ণ মন্তব্য করতে থাকে কিছু নামধারী সাংবাদিক। তারা নিজেরাই গায়ে পড়ে ঝগড়া বাঁধিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের লোকজন তাদের সার্কিট হাউস চত্বর ত্যাগ করতে বললেও তারা বারবার ফিরে এসে সাংবাদিকদের সঙ্গে তর্কাতর্কিতে জড়িয়ে পড়ে এবং ঝগড়াঝাঁটির পরিস্থিতি তৈরির অপচেষ্টা চালায়।
প্রেস ক্লাব নেতৃবৃন্দ বলেন, এ ঘটনায় জড়িতদের অনেকেই ছাত্র-জনতা হত্যাসহ বিভিন্ন মামলার আসামি। তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করার কারণেই তারা একের পর এক ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণ করে যাচ্ছে। তাই তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
বিবৃতিতে সাংবাদিক নেতারা আরও বলেন, সাংবাদিকতার নামে বিগত ৪০ বছর ধরে দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তপনার যে সিন্ডিকেট প্রেস ক্লাবকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল, গত ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর সেই সিন্ডিকেট তাদের দখল হারিয়েছে। ফলে তারা এখন উন্মাদের মতো আচরণ করছে এবং বিভিন্ন ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছে। এমনকি তারা সাংবাদিকদের দুর্বৃত্ত ও ডাকাত বলার দুঃসাহস দেখাচ্ছে।
তারা অভিযোগ করেন, অতীতে প্রেস ক্লাবের পরিচালনা কমিটির নাম ব্যবহার করে জাতীয় পার্টির নেতা-মন্ত্রী ও এমপিদের চাটুকারিতা করা হয়েছে। পরবর্তীতে ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৭ সাল পর্যন্ত বিএনপির নেতা-মন্ত্রীদেরও তোষামোদ করা হয়েছে এবং নানা সুযোগ-সুবিধা আদায় করা হয়েছে। একইভাবে গত ১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগের নেতাদের তোষামোদ করে সুবিধা নেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, গত ১৭ বছর প্রেস ক্লাবে অন্য কোনো মতাদর্শের মানুষকে নেতৃত্বে আসতে দেওয়া হয়নি। এমনকি ভিন্ন মতাদর্শের সাংবাদিকদের সদস্যপদও দেওয়া হয়নি। প্রেস ক্লাবের ইতিহাসে এমন ঘটনাও রয়েছে যে, একজন সভাপতির অফিসের পিয়ন কিংবা তার পত্রিকার অ্যাকাউন্ট্যান্ট—যিনি জীবনে কোনো দিন এক মিনিটের জন্যও সাংবাদিকতা করেননি—তাকেও সদস্য করা হয়েছে শুধুমাত্র পকেট ভোট নিশ্চিত করার জন্য। এ ধরনের আরও বহু উদাহরণ রয়েছে।
নেতৃবৃন্দ বলেন, সাংবাদিকদের হাউজিং সোসাইটির কবরস্থানের জায়গা নিজেদের স্ত্রীর নামে করে বাইরে বিক্রি করার মতো ঘটনাও ঘটেছে। অথচ তারাই এখন নিজেদের বড় সাংবাদিক নেতা হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণেই চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব একটি কুক্ষিগত কোটারি ভিত্তিক সংগঠনে পরিণত হয়েছিল। তাদের কোটারি ভেঙে যাবে এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে—এই আশঙ্কায় তারা পেশাদার সাংবাদিকদের কখনো সদস্যপদ দেয়নি।
বিবৃতিতে বলা হয়, এসব কোটারি, লুটেরা ও কবরখেকোদের চিহ্নিত করে বহিষ্কার করায় আজ তাদের মাথাব্যথা শুরু হয়েছে।
নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, অতীতে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবকে ব্যবহার করে বিভিন্ন বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে বিজ্ঞাপন ও অর্থ সংগ্রহ করা হতো। একইভাবে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকেও নিয়মিত মাসোহারা নেওয়া হতো। বর্তমানে এসব অনিয়ম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা উন্মত্ত আচরণ করছে।
প্রেস ক্লাব নেতারা বলেন, এসব ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তারা আর প্রেস ক্লাবে প্রবেশ করতে পারবে না। পাশাপাশি প্রেস ক্লাবের জায়গায় যেসব প্রতিষ্ঠানের অফিস রয়েছে, তারা যদি বর্তমান কমিটির সিদ্ধান্ত অমান্য করে, তবে তাদেরও অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হবে।
তারা আরও বলেন, চট্টগ্রাম শহরের সবাই জানে—কেউ কেউ সরকারি স্কুলে ভর্তি বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত, কেউ জীবনে ক্যামেরাম্যান ছাড়া কখনো সাংবাদিকতা করেননি, আবার কেউ বিভিন্ন সরকারি অফিস বা শিল্পপতির সঙ্গে নানা ধরনের সরবরাহ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। এসব দুর্বৃত্তদের প্রতিহত করে প্রেস ক্লাব থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।
প্রেস ক্লাব নেতারা বলেন, কোনো মন্ত্রীর বা এমপির পা চেটে আর প্রেস ক্লাবে প্রবেশ করা যাবে না। কারণ প্রেস ক্লাব কারও পৈত্রিক সম্পত্তি নয়। যারা চাটুকারিতা করেছে তারা বের হয়ে গেছে। তবে সাধারণ সদস্যরা প্রেস ক্লাবের সদস্য হিসেবেই থাকবেন এবং প্রেস ক্লাবের সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, নতুন করে যেসব পেশাদার সাংবাদিক দীর্ঘদিন বঞ্চিত ছিলেন, তাদের সদস্যপদ দেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও দেওয়া হবে। কোনো চাটুকার, দলকানা, দলবাজ, চাঁদাবাজ, ভূমিখোর বা কবরখেকোদের প্রেস ক্লাবে জায়গা হবে না। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মতো নেতাকে ২০১৮ সালের পর চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে কোনো অনুষ্ঠান করতে দেওয়া হয়নি। একইভাবে চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ানকেও সেখানে কোনো অনুষ্ঠান করতে দেওয়া হয়নি।
তারা বলেন, যারা গত ১৭ বছর এসব নেতাদের সম্মান জানায়নি বা প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠান করতে দেয়নি, তারা এখন বিভিন্ন নেতা-মন্ত্রী-এমপিদের তোষামোদ শুরু করেছে। এ ধরনের চাটুকারদের চিনে রাখার আহ্বান জানান তারা।
বিবৃতিতে বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃবৃন্দসহ সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশে অনুরোধ জানিয়ে বলা হয়, প্রেস ক্লাবের নাম ব্যবহার করে যারা গত ১৭ বছর আওয়ামী লীগের চাটুকারিতা করেছে, তাদের যেন কোনোভাবেই আশ্রয় বা প্রশ্রয় দেওয়া না হয়।
চাটগাঁ নিউজ/এমকেএন





