জাহিদ হাসান: আগামীকাল রোববার থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে শুরু হতে যাওয়া শ্রমিকদের ধর্মঘট বাড়াতে পারে আসন্ন রমজানে ভোগ্যপণ্যের দাম। ফলে বিপাকে পড়তে যাচ্ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তরা, যারা রমজানে স্বল্প আয়ে চেষ্টা করেন পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি ফোটানোর। এর প্রেক্ষিতে বন্দরে চলমান অচলাবস্থা নিরসনে এবং রবিবার থেকে ঘোষিত অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট প্রত্যাহারে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের জরুরি ও ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা।
শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টাকে দেওয়া এক খোলা চিঠিতে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন (বিইএফ), বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ), বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)-এর নেতারা এই উদ্বেগের কথা জানান।
জানা গেছে, এবার রোজার ভোগ্যপণ্য আমদানি-মজুতে ভালোই অগ্রগতি ছিল। ধারণা ছিল- গতবারের ন্যায় এবারের রমজানেও পণ্যের দামে কিছুটা স্বস্তিতে থাকবে। কিন্তু বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলনকে পুঁজি করে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ানোর পায়তারা করছে অসাধু ব্যবসায়ীরা।
এদিকে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দুদিনের ছুটি ও সাপ্তাহিক ছুটিসহ টানা চারদিন বন্ধের কারণে রোজার আগে দুই সপ্তাহে কর্মদিবস রয়েছে মাত্র সাতদিন। এর মধ্যে সপ্তাহের শুরুতে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শ্রমিক-কর্মচারীদের ডাকা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে ভোগ্যপণ্যের চেইনে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটবে। এতে ছোলা, ডাল, তেল, চিনি, খেজুরের দাম বহুগুণে বেড়ে যেতে পারে বলে জানয়েছেন বিশ্লেষকরা।
ভোক্তা সংগঠনগুলোর মতে- বন্দর সংকটকে পুঁজি করে কতিপয় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট বাজারে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে। এতে সাধারণ ভোক্তারা বিপাকে পড়বেন।
বিষয়টি নিয়ে ভোক্তাদের সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার রোজার আগেই দায়িত্ব হস্তান্তর করার ঘোষণা দিয়েছেন। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন। বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা চাইলে নির্বাচিত সরকার এলে আন্দোলন করতে পারতেন। এক্ষেত্রে নির্বাচিত সরকার তাদের দাবির বিষয়ে চিন্তা করতে পারতেন। কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সে সুযোগ নেই।’
তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে জানান, রমজান সামনে রেখে পণ্যের বাজার অস্থিতিশীল করার জন্য একটি চক্র কাজ করছে। নানান সংস্থার ইন্ধনও থাকতে পারে এ আন্দোলনে। রোজা সামনে রেখে বন্দরে পণ্য খালাস বন্ধ থাকলে পণ্যের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাজার অস্থির হবে, দাম বাড়বে। এ লক্ষ্যে ধর্মঘটের ডাক হতে পারে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল কবীর সুজন বলেন, ‘গত সপ্তাহের পুরোটা বন্দরের সংকটের কারণে আমদানি-রপ্তানি পণ্যের জট তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি আর মাত্র কয়েকদিন পরে রোজা। রোজায় এমনিতে কিছু পণ্যের চাহিদা থাকে। ইতোমধ্যে রোজার জন্য আমদানি করা অনেক পণ্য চলে এসেছে। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে এখন কয়েকটি জাহাজ পণ্য নিয়ে খালাসের জন্য অবস্থান করছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘রোববার থেকে পুনরায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট ডেকেছে শ্রমিক কর্মচারীরা। শ্রমিকদের ঘোষণা অনুযায়ী রোববার বহির্নোঙরেও তারা কাজ বন্ধ রাখবে। যেটি আগের কোনো আন্দোলনে বহির্নোঙরে কাজ বন্ধ থাকেনি।’
বহির্নোঙরে কাজ বন্ধ থাকলে বাল্কপণ্য খালাস করতে না পারলে ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়বে- এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘রোজার পণ্যের সরবরাহ চেইনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে বাজারে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে পণ্যের দাম দ্রুত বেড়ে যাবে। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে ভোক্তার ওপর। পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার চাপটা সাধারণ মানুষকে পোহাতে হবে।’
খাতুনগঞ্জের মসলা ও ডালজাতীয় পণ্যের ব্যবসায়ীরা নাম প্রকাশ না করে জানান, ‘বন্দরে শ্রমিকদের আন্দোলনে গত শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পণ্য খালাস বন্ধ ছিল। এতে আমদানি করা ভোগ্যপণ্যের দামে প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে ছোলা, মটরসহ রোজার প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। রোববার থেকে পুনরায় ধর্মঘট শুরু হলে সামনে রোজার বাজারে স্বাভাবিকভাবে পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। দাম বাড়ার প্রভাব সাধারণ মানুষের ঘাড়ে গিয়ে পড়বে। বিশেষ করে কম আয়ের মানুষদের রোজায় নতুন ভোগান্তিতে পড়তে হবে।’
চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল আলম বলেন, ‘বন্দরে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘটে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস আরও এক সপ্তাহ পিছিয়ে গেছে। গত সপ্তাহেও অনেক জাহাজ থেকে খেজুরসহ আমদানি করা ফল খালাস করা সম্ভব হয়নি। এ সপ্তাহের শুরুতে খালাস বন্ধ হলে রোজার আগে ফলের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। গত সপ্তাহের সংকটে এমনিতে ফলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। পাইকারিতে খেজুরে কেজিপ্রতি ১০-২০ টাকা বেড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমদানি করা ফল নির্ধারিত সময়ে বাজারে না এলে চাহিদার বিপরীতে সরবরাহে সংকট তৈরি হবে, দাম বাড়বে সত্য। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের পরে বাজারে এলে তখন চাহিদা থাকবে না। ফলে আমদানিকারকরা লোকসানের মুখে পড়বেন।’
অন্যদিকে ব্যবসায়ী নেতারা চট্টগ্রাম বন্দরকে ‘জাতীয় অর্থনীতির প্রাণভোমরা’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, দেশের মোট কন্টেইনার যাতায়াতের ৯৯ শতাংশ এবং সমুদ্রপথের বাণিজ্যের ৭৮ শতাংশ এই বন্দরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। বন্দরে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে প্রধান রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়বে। এছাড়া রমজান মাসের আগে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে।
উপদেষ্টাকে পাঠানো চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন বিইএফ সভাপতি ফজলে করিম এহসান, বিজিএমইএ-র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান, বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এবং বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল।
প্রসঙ্গত, গত সপ্তাহের শনিবার থেকে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের ব্যানারে ৮ ঘণ্টার কর্মবিরতি শুরু করে বন্দরের শ্রমিকরা। পরে সোমবার থেকে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা এবং মঙ্গলবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতির কর্মসূচি পালন করে।
বৃহস্পতিবার উপদেষ্টার আশ্বাসে ধর্মঘট দুদিন স্থগিত করেন শ্রমিক কর্মচারীরা। দুদিন পেরোতেই আজ শনিবার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে চার দফা দাবি জানিয়ে রোববার থেকে ফের অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দেয় বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদের ব্যানারে এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নেতা মো. হুমায়ুন কবীর ও মো. ইব্রাহীম খোকন।
চাটগাঁ নিউজ/জেএইচ





