নির্বাচন কলঙ্কিত হলে গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হবে

নাজিম উদ্দিন চৌধুরী এ্যানেল: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়ছে। নির্বাচনের বাকি আর মাত্র কয়েক দিন। সব দলের প্রস্তুতি প্রায় শেষ। শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন বিভিন্ন দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।

কিন্তু উৎসুক ভোটাররা জানিয়েছেন, এবারের নির্বাচনে মাঠে-ময়দানে উৎসবমুখর ভোটের কোনো আমেজ পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

নির্বাচনের পরিবেশ দেখতে দেশের বিভিন্ন উপজেলা, চট্টগ্রাম মহানগর এবং রাজধানী ঢাকা সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়—পোস্টারবিহীন নির্বাচন অর্থাৎ পোস্টার না থাকায় এবারের নির্বাচন উৎসবের আমেজ তৈরি করতে পারেনি।

১/১১ সরকারের আমলে নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী দেয়ালে পোস্টার লাগানোর পরিবর্তে দড়ি দিয়ে পোস্টার ঝোলানোর যে সংস্কার হয়েছিল, সেটিই ছিল বৈপ্লবিক ও বুদ্ধিভিত্তিক সংস্কার। নির্বাচন শেষ হলে এক দিনের মধ্যেই সব পোস্টার অপসারণ করা সম্ভব ছিল এবং এটি ছিল পরিবেশবান্ধব। এর মাধ্যমে সমগ্র শহর ও পাড়া-মহল্লার মোড়, সড়ক ও অলিগলিতে পোস্টার নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখত।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পূর্বে পাড়া-মহল্লা, মাঠ-ঘাট, অফিস-আদালতে যেভাবে প্রার্থীদের ঘিরে সমর্থক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও উদ্দীপনা দেখা যেত, এবারের নির্বাচনে সেই আগ্রহে ভাটা পড়েছে। অনেকেই ধারণা করছেন, এক ধরনের ঝাপসা ও ধূসর নির্বাচন হতে যাচ্ছে।

অনেকের মতে, নির্বাচনে পোস্টার তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রেস মালিক ও শ্রমিকসহ বাংলাদেশের অধিকাংশ মুদ্রণ শিল্প। নির্বাচনও হারিয়েছে তার ৫৪ বছরের ঐতিহ্য ও নির্বাচনী সৌন্দর্য। অন্যদিকে ফেস্টুন ও ব্যানারনির্ভর নির্বাচন পোস্টারের তুলনায় বহু গুণ বেশি ব্যয়বহুল।

সাধারণ জনগণ দাবি তুলেছেন, ভবিষ্যতের নির্বাচনগুলোতে পোস্টার অবশ্যই সংযোজন করতে হবে—তাহলেই নির্বাচনের পরিবেশ ও সৌন্দর্য ফিরে আসবে।

বাংলাদেশ প্রেসক্লাব, আরব আমিরাতের সভাপতি শিবলী আল সাদিক বলেছেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে যে উৎসব দেখা যেত, সেই উৎসবের আমেজও এখন পরিলক্ষিত হচ্ছে না। তিনি বলেন, “দেশে এসেছি ভোটের উৎসবে শামিল হতে, কিন্তু এসে নির্বাচনের বাস্তবতা দেখে আশাহত হলাম।” তাঁর মতো নির্বাচন নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন আরও অনেকে।

ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি দল তারুণ্যনির্ভর ইশতেহার ঘোষণা করেছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে ফুল গিয়ারে কাজ করে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যক্তি-কেন্দ্রিক প্রচার-প্রচারণা থাকলেও মাঠে-ময়দানের রাজনীতিতে ভোটের উৎসব বা আমেজ এখনো তৈরি হয়নি। এদিকে গণভোটে সরকারের নিরপেক্ষতার ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে শেষ মুহূর্তে এসে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে সরকারের প্রচার বৈধ নয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কাজ ছিল একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও দলনিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিয়ে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করা। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন যদি কলঙ্কিত হয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে গণতন্ত্র।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ছিল একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা। কিন্তু তাদের আগ্রহ বেশি ছিল ‘হ্যাঁ’ ভোটের দিকে। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক অনেক আগেই বলেছেন, ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকারের প্রচার কার্যক্রমের কোনো সুযোগ নেই। শেষ পর্যন্ত সেটাই সত্য প্রমাণিত হয়েছে।

নির্বাচনে ডিপফেক আতঙ্ক ও উত্তরণের উপায়

এআই প্রযুক্তির কারণে বর্তমান নির্বাচন অনেকটাই সোশ্যাল মিডিয়ানির্ভর। ফলে আতঙ্কের আরেক নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে ডিপফেক ভিডিও। ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রামসহ অসংখ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভোটের আগমুহূর্তে ডিপফেক আতঙ্ক তৈরি হতে পারে।

ডিপফেক আতঙ্ক কীভাবে কাজ করে—ধরা যাক, চট্টগ্রামের কোনো একটি আসনে দুজন সমান জনপ্রিয় প্রার্থী রয়েছেন। ভোটের দিন সকালে হঠাৎ একটি ভিডিও ভাইরাল হলো, যেখানে এক প্রার্থী (ছদ্মনাম) ঘোষণা দিচ্ছেন, “আমি আশা আলম জনাব ভরসা উদ্দিনকে সমর্থন জানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালাম।”

এআই প্রযুক্তিনির্ভর এই ভুয়া ডিপফেক ভিডিও ভাইরাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নির্বাচনের সমীকরণ বদলে যেতে পারে। ঘণ্টা দুয়েক পর আশা আলম ও তাঁর সমর্থকেরা জানতে পারবেন, ভিডিওটি আসলে ভুয়া এবং এটি এআই দিয়ে তৈরি। কিন্তু ততক্ষণে ক্ষতি যা হওয়ার, তা হয়ে গেছে।

তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো ভিডিও দেখলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করার আগে যাচাই করা জরুরি।

এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে আগামী ৪ ডিসেম্বর ইউথ ভয়েস অব বাংলাদেশ-এর উদ্যোগে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ কনফারেন্স হলে একটি গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা ব্যারিস্টার তারেক আকবর খোন্দকার জানিয়েছেন, ডিপফেক আতঙ্কে প্রার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সবাই উদ্বিগ্ন। চট্টগ্রামের পর ঢাকাতেও এ ধরনের আরও একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।

এ ছাড়া ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর কথাও শোনা যাচ্ছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইউনূস গত কয়েক মাস ধরেই বলে আসছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু করতে হবে—এটি দেশের ভাগ্য নির্ধারণের নির্বাচন। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন বলেছে, তারা কোনো দলের চাপে নেই এবং দেশের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ একটি নির্বাচন উপহার দেবে।

ইতিহাসে কেমন একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে যাচ্ছে, তা দেখার জন্য ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। নির্বাচনের পরপরই দ্রুত ফলাফল ঘোষণার আশা করছেন দেশের জনগণ।

লেখক: সমাজচিন্তক ও কলামিস্ট
সাধারণ সম্পাদক- বাংলাদেশ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি

Scroll to Top