চাটগাঁ নিউজ ডেস্ক : বাংলাদেশের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ ও কোণঠাসা থাকা ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে এবং দলটিকে ‘বন্ধু’ হিসেবে পেতে আগ্রহী ঢাকার মার্কিন কূটনীতিকরা। ওয়াশিংটন পোস্টের হাতে আসা কিছু অডিও রেকর্ডিংয়ের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানানো হয়েছে। এই নতুন কূটনৈতিক অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে নতুন করে টানাপড়েন তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১ ডিসেম্বর নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ঢাকার একজন মার্কিন কূটনীতিক মন্তব্য করেন যে, বাংলাদেশ বর্তমানে অনেকটা ‘ইসলামপন্থী ধারায়’ মোড় নিয়েছে। ওই কূটনীতিক পূর্বাভাস দেন যে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী অতীতে যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো ফল করবে।
দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, জামায়াতের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের এই নমনীয় মনোভাব দিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বড় ধরনের দূরত্ব তৈরি করতে পারে। ভারত ঐতিহাসিকভাবেই জামায়াতকে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে থাকে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে, তবুও মার্কিন কূটনীতিকরা সতর্ক করেছেন যে, জামায়াত যদি ক্ষমতায় এসে কট্টর শরিয়াহ আইন বা এমন কোনো বিতর্কিত নীতি চাপিয়ে দেয় যা ওয়াশিংটনের স্বার্থবিরোধী, তবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ওপর ১০০ শতাংশ ট্যারিফ বা শুল্ক আরোপের মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে ট্রাম্প প্রশাসন। নিচে ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হলো-
বাংলাদেশের বৃহত্তম ইসলামি দলটি আগামী মাসের নির্বাচনে তাদের ইতিহাসের সেরা ফলাফল অর্জনের পথে রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন কূটনীতিকরা দলটির সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন। ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর হাতে আসা কিছু অডিও রেকর্ডিং থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
জামায়াতে ইসলামী দলটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একাধিকবার নিষিদ্ধ হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া ‘লৌহমানবী’ খ্যাত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে দলটি নিষিদ্ধ ছিল। ঐতিহ্যগতভাবে দলটি শরিয়াহ আইন এবং শিশুদের দেখাশোনার সুবিধার্থে নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর পক্ষে কথা বললেও, সম্প্রতি তারা জনসম্মুখে নিজেদের ভাবমূর্তি পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। বর্তমানে তাদের প্রধান লক্ষ্য দুর্নীতি নির্মূল করা বলে তারা দাবি করছে।
বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মার্কিন কূটনীতিকরা পুনরুত্থিত এই ইসলামি আন্দোলনের সঙ্গে কাজ করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ১ ডিসেম্বর নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ঢাকায় নিযুক্ত একজন মার্কিন কূটনীতিক বলেন, বাংলাদেশ ‘ইসলামি ধারায় ঝুঁকেছে’ এবং ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ‘আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো করবে’।
অডিও রেকর্ডিং অনুযায়ী ওই কূটনীতিক বলেন, “আমরা তাদের বন্ধু হিসেবে পেতে চাই।” তিনি সাংবাদিকদের কাছে জানতে চান তারা জামায়াতের প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠনের সদস্যদের নিজেদের টকশোতে আমন্ত্রণ জানাবেন কি না। তিনি জিজ্ঞেস করেন, “আপনারা কি তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন? তারা কি আপনাদের অনুষ্ঠানে আসবে?”
নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করা ওই কূটনীতিক জামায়াত কর্তৃক শরিয়াহ আইন চাপিয়ে দেওয়ার আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেন। তিনি জানান, ওয়াশিংটনের হাতে এমন কিছু ‘লিভারেজ’ বা নিয়ন্ত্রণমূলক কৌশল রয়েছে যা তারা প্রয়োজনে ব্যবহার করতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, “আমি বিশ্বাস করি না যে জামায়াত শরিয়াহ চাপিয়ে দিতে পারবে। যদি তারা উদ্বেগের কোনো পদক্ষেপ নেয়, তবে পরদিনই তাদের ওপর ১০০ শতাংশ ট্যারিফ (শুল্ক) আরোপ করা হবে।”
ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শাই এক বিবৃতিতে বলেন, “ডিসেম্বরের ওই আলোচনাটি ছিল মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্থানীয় সাংবাদিকদের একটি রুটিনমাফিক অফ-দ্য-রেকর্ড বৈঠক।” তিনি আরও যোগ করেন, সেখানে অনেকগুলো রাজনৈতিক দল নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র কোনো বিশেষ দলের পক্ষ নেয় না। জনগণের দ্বারা নির্বাচিত যেকোনো সরকারের সঙ্গেই তারা কাজ করবে।
জামায়াতে ইসলামীর মার্কিন মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান এক বিবৃতিতে জানান, “একটি ব্যক্তিগত কূটনৈতিক বৈঠকের মন্তব্য নিয়ে আমরা কোনো মন্তব্য করতে চাই না।”
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে ফাটল?
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান মনে করেন, জামায়াতের প্রতি আমেরিকার এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে দূরত্ব তৈরি করতে পারে। ভারত দীর্ঘদিন ধরেই জামায়াতকে পাকিস্তানের মিত্র এবং তাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে আসছে।
তবে মনিকা শাই তার বিবৃতিতে দাবি করেছেন যে, বাংলাদেশের নির্বাচন ভারত-মার্কিন সম্পর্কের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না।
‘মূলধারার’ রাজনীতিতে জামায়াত
২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনের পর নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুবাশার হাসান বলেন, জামায়াত এখন বাংলাদেশের ‘মূলধারার’ রাজনীতিতে ফিরে এসেছে।
জামায়াতের মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান জানান, তারা ‘দুর্নীতিবিরোধী, স্বচ্ছতা ও সুশাসন’-এর ইশতেহারে নির্বাচন করছেন। নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর প্রস্তাবটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে আছে এবং শরিয়াহ আইন বাস্তবায়নের কোনো তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা তাদের নেই।
নির্বাচনে জামায়াতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, যিনি ২৫ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে দেশে ফিরেছেন, নির্বাচনে জয়ী হলে প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন জামায়াত ভালো ফলাফল করবে, তবে তিনি তাদের জোটে নিতে আগ্রহী নন। যদিও জামায়াত আমির শফিকুর রহমান রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তারা বিএনপির সঙ্গে মিলে সরকার গঠনে আগ্রহী।
অর্থনৈতিক সতর্কতা
ঢাকার বৈঠকে ওই মার্কিন কূটনীতিক সতর্ক করেন যে, জামায়াত যদি ক্ষমতায় এসে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যবোধের পরিপন্থী কোনো পদক্ষেপ নেয়, তবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ওপর আঘাত আসবে।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ২০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে যায়। যদি নারীদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেওয়া হয় বা তাদের বের করে দেওয়া হয়, তবে অর্ডার আসা বন্ধ হয়ে যাবে। আর অর্ডার না থাকলে বাংলাদেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে।”তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, জামায়াত এমনটা করবে না কারণ দলটিতে অনেক শিক্ষিত ও বুদ্ধিমান মানুষ রয়েছেন।
চাটগাঁ নিউজ/এসএ






