‘ঈদে বাড়ি ফেরা’— বাড়তি ভাড়ার চাপে চিড়েচ্যাপ্টা যাত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক : ঈদে নাড়ির টানে বাড়ির পথে বেরিয়ে পড়েছে লাখো কর্মজীবী ‍মানুষ। কিন্তু গণপরিবহনগুলো যাত্রীদেরকে একপ্রকার জিম্মি করে গলাকাটা ভাড়া আদায় করছে। অতিরিক্ত ভাড়ার চাপে তাদের ঈদ আনন্দ যেন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের লোক দেখানো অভিযানে গণপরিবহন সংশ্লিষ্টদের টিকিটিও ছুঁতে পারছে না। সবকটি রুটেই গণপরিবহনগুলোর যেন ‘ডোন্ট কেয়ার’ ভাব।

চট্টগ্রাম থেকে আন্তঃ জেলার প্রায় সবকটি রুটে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ ভাড়া গুনতে হচ্ছে যাত্রীদের। একদিকে অতিরিক্ত ভাড়া তারওপর পথে পথে নানা ভোগান্তিতে পড়ে যাত্রীদের বাড়ি যাওয়ার উচ্ছ্বাস ফিকে হওয়ার উপক্রম।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরীর কদমতলী-শুভপুর বাস স্টেশন, গরীবুল্লাহ শাহ বাস কাউন্টার, শাহ আমানত সেতু বাস স্টেশন ও অলংকার মোড়ে শত শত যাত্রী বাড়ি যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন। তবে গণপরিবহনগুলো সৃষ্টি করে রেখেছে বাস সংকট। বাস সংকট দেখিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে তারা আদায় করছে দ্বিগুণ ভাড়া।

কদমতলী বাস স্টেশন থেকে ফেনী ছাগলনাইয়া গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে এসেছিলেন মাহফুজ নামের এক যাত্রী। টিকিট কাটতে গিয়ে ‘বাঁধন পরিবহন’র কাউন্টারে ভাড়ার কথা শুনে তিনি হতভম্ব! ফেনীর নির্ধারিত ভাড়া ১৫০ টাকা। কিন্তু বাঁধন পরিবহনের ভাড়া ৪০০ টাকা। এমন অতিরিক্ত ভাড়ার কারণ জিজ্ঞেস করতেই যাত্রী মাহফুজকে শুনতে হয়েছে পরিবহন সংশ্লিষ্টদের দু’চার কথা।

আক্ষেপ করে মাহফুজ বলেন, ‘অন্যান্য সময় ফেনীর টিকিট কাটি সাধারণত ১৫০ টাকা। কিন্তু এখন কইতাছে ৪০০ টাকা লাগবো। মগের মুল্লুক অবস্থা। উপায় নাই। বাড়িত যাওন লাগবো। তাই টিকিট কাইট্যা লইছি। এ গাড়ি আবার অলংকার পর্যন্ত যাইতে যাইতে বিভিন্ন স্থান থেইক্যা যাত্রী উঠাইবো। বাড়িত যাইতাছি বাবা-মা, ভাই-বেরাদর লইয়া ঈদ করুম। তয়, গাড়ি ভাড়ার জ্বালায় বাড়িত যাইতে মন চায় না।’

চট্টগ্রাম থেকে নোয়াখালীর নির্ধারিত ভাড়া ৩০০ টাকা। কিন্তু ঈদ উপলক্ষে যাত্রীদেরকে ভাড়া গুনতে হচ্ছে ৫০০ টাকা। একই অবস্থা দিনাজপুর, খুলনা, বরিশাল, ঝালকাঠি, রংপুর রুটেও।

নগরীর গরীবুল্লাহ শাহ মাজার সংলগ্ন বাস কাউন্টারে এসে মাথায় হাত খুররম আলীর। পরিবার পরিজন নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছেন রংপুর গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার জন্য। কিন্তু ১২০০ টাকার টিকিট কাটতে হচ্ছে ১৭০০ টাকায়।

ভাড়া যন্ত্রণার সাথে ঈদ যাত্রীদেরকে সইতে হচ্ছে কাউন্টারে নিয়োজিত গণপরিবহন কর্মীদের ‘টানাটানি’ বিড়ম্বনা। টিকিট কাউন্টারগুলোকে সহযোগিতা করতে গণপরিবহনগুলো কমিশন ভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে কিছু কর্মীকে। এসব কর্মীরা যাত্রী দেখলেই ছুটে এসে কেউ যাত্রীদের ব্যাগ-লাগেজ, কেউ যাত্রী বা তাদের সন্তানদের হাত ধরে টানাটানি শুরু করেন। টানাটানি বিড়ম্বনায় বাস কাউন্টারগুলোতে যাত্রীদের বিব্রতকর অবস্থা। এমন বিব্রতকর অবস্থার মুখে যাত্রীদেরকে তড়িঘড়ি করে টিকিট কেটে নিতে হচ্ছে।

আন্তঃজেলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কফিল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ঈদ উপলক্ষে আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সাথে বৈঠকে বসেছিলাম। বৈঠকে ৫০ টাকা ভাড়া বেশি নেয়ার ব্যাপারে প্রস্তাব করেছিলাম। মিটিংয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণসহ অন্যান্যরাও উপস্থিত ছিলেন। বর্তমানে সব যাত্রী চট্টগ্রাম থেকে বাড়িতে যাচ্ছে। যাওয়ার সময় বাসভর্তি যাত্রী। কিন্তু চট্টগ্রামে আসার সময় খালি গাড়ি নিয়ে আসতে হয়। আমাদের বিষয়টিও সবাইকে ভাবতে হবে। চার্টের বেশি ভাড়া কোথাও নেয়া হচ্ছে না।

নগরীর শাহ আমানত সেতুর পশ্চিম পার্শ্বস্থ নতুন ব্রিজ মোড় এলাকায় অসহনীয় ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন দক্ষিণ চট্টগ্রামের যাত্রীরা। আমিরাবাদ, লোহাগাড়া, কেরানীহাট, চকরিয়ার যাত্রীদেরকে ভাড়া দিতে হচ্ছে নির্ধারিত ভাড়ার দ্বিগুণ। স্বাভাবিক সময়ে এসব স্টেশনের ভাড়া ১০০ থেকে ১৫০ টাকা হলেও ঈদের ভাড়া গুনতে হচ্ছে দ্বিগুণ। তাছাড়া নতুন ব্রিজ এলাকায় অন্যান্য সময় পর্যাপ্ত বাস থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে ভিন্নদৃশ্য দেখা গেছে। একটা করে বাস কোথা থেকে যেন উড়ে আসছে। আর দ্বিগুণ ভাড়ায় যাত্রী নিয়ে শাঁই করে চলে যাচ্ছে। বাস নেই, শত শত যাত্রী। ফলে বাড়তি ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন যাত্রীরা।

ঈগল পরিবহনের চালক মো. মনসুর মিয়া জানান, ঈদের সময় নতুন ব্রিজে পুলিশ গাড়ি দাঁড়াতে দেয় না। আমরা টার্মিনাল থেকে আসছি। ঈদের সময় দুটো বাড়তি পয়সা রনা পেলে গাড়ির মালিক-শ্রমিকরা কিভাবে বাঁচবে।

এ ব্যাপারে কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান এস এম নাজের হোসাইন চাটগাঁ নিউজকে বলেন, ঈদের সময় মানুষ বাড়ি ফিরেন। কিন্তু অতিরিক্ত গাড়ি ভাড়ার বিড়ম্বনা সহ্য করতে হয়। যান পরিবহনের দায়িত্বশীল সংস্থা বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটিকে (বিআরটিএ) এবার মাঠে দেখা যায়নি। অথচ তাদের মাঠে থাকার কথা। ভোক্তা অধিকার কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন বাস কাউন্টারে অভিযান চালিয়েছে। জেলা প্রশাসন রমজান মাসজুড়ে বিভিন্ন বাজারে অভিযান চালিয়েছে। গণপরিবহনে অভিযান হয়তো শুরু হবে। ট্রাফিক পুলিশও আন্তরিক চেষ্টা করে যাচ্ছে। ঈদকে কেন্দ্র করে গাড়ির মালিকরা ভাড়া বাড়াচ্ছে, মাছ-মুরগিওয়ালা মাছ-মুরগীর দাম বাড়াচ্ছে- এ দাম বাড়ানো বিষয়টি আমাদের এখন সংস্কৃতিতে পরিণত হয়ে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (জনসংযোগ) মাহমুদা বেগম বলেন, ঈদের সময় একটু প্রবলেম হয়। আমরা বাস মালিকদের সঙ্গে মিটিং করেছিলাম। উনারা অতিরিক্ত ভাড়া নেবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবুও অভিযোগ পেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে। জনভোগান্তি যাতে না হয়, সে বিষয়ে আমরা সতর্ক রয়েছি। নগরীর প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ট্রাফিক বিভাগ আন্তরিক দায়িত্ব পালন করছেন।

এদিকে, চট্টগ্রাম থেকে চরফ্যাশন, ভোলা, হাতিয়া, মনপুরা তজুমুদ্দিন যেতে হলে ৪/৫ গাড়ি বদলাতে হয় যাত্রীদের। পথে পথে রয়েছে নানা ভোগান্তি। সময় লাগে প্রায় ২৪ ঘন্টার কাছাকাছি। প্রায় সময় দিনও পেরিয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট এলাকার এসব দুর্ভাগা যাত্রীদের জন্য এবার ঈদে লঞ্চ সার্ভিস চালু করা হয়েছে।
গত ২০ মার্চ থেকে এই লঞ্চ সার্ভিস চালু করেছে দুটি নৌযান সংস্থা। এম ভি বার আউলিয়া ও কর্ণফুলী এক্সপ্রেস নামে দুটি লঞ্চ সার্ভিস চট্টগ্রাম থেকে চরফ্যাশনের বেতুয়াঘাট-লালমোহন মঙ্গল সিকদার-তজুমুদ্দিন-মনপুরা-হাতিয়া-ঢালচর হয়ে চট্টগ্রামের সদরঘাট লঞ্চ ঘাটে যাত্রা শুরু করেছে। চট্টগ্রাম থেকে চরফ্যাশন পর্যন্ত রুটে এ সার্ভিসের সময় লাগে মাত্র ৯ ঘন্টা।

এ ব্যাপারে এম ভি বার আউলিয়ার জিএম (এডমিন) মাহবুবুর রহমান বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে এ সার্ভিস চালু করা হয়েছে। লঞ্চের ইকোনমি ক্লাসের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০০ টাকা থেকে এক হাজার টাকা, কেবিন ১৬০০ টাকা থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।

চাটগাঁ নিউজ/ইউডি/এসএ

Scroll to Top